স্বামীকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে স্ত্রী

যা জানা জরুরি
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে নথি গৃহীত হয়েছিল, বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছিলেন।
- তারপরও ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে স্বামীকে আটক করা হয়েছে বলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মুর্শিদাবাদের দেজিনা বিবি।
- তাঁর স্বামী সাহিদুল শেখকে ৮ অগস্ট রাতে রানিনগর থানার পুলিশ নিয়ে যায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে নথি গৃহীত হয়েছিল, বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছিলেন। তারপরও ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে স্বামীকে আটক করা হয়েছে বলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মুর্শিদাবাদের দেজিনা বিবি। তাঁর স্বামী সাহিদুল শেখকে ৮ অগস্ট রাতে রানিনগর থানার পুলিশ নিয়ে যায়।
পেশায় চাষি সাহিদুলের স্ত্রী দাবি করেছেন, স্বামীর পরিচয়পত্র ও সম্পত্তির নথি রয়েছে। কিন্তু আটকের পরে পরিবারকে গ্রেফতারির স্মারক বা বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর তালিকা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন আইনজীবী বাপি মণ্ডল। আদালতে হাজির না করার অভিযোগও তুলেছে পরিবার।
রাজ্যের পাল্টা দাবি, সাহিদুল বাংলাদেশ থেকে বেআইনিভাবে এসে এক মৃত স্থানীয় বাসিন্দার ছেলে পরিচয়ে জাল পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় তা স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, কথিত স্বীকারোক্তি পুলিশের কাছে, না পুলিশ সুপার তথা বিদেশি নিবন্ধন আধিকারিকের কাছে দেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য আটকের বা গ্রেফতারির স্মারক আইনজীবীকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রানিনগর পুলিশকে দু’সপ্তাহের মধ্যে আটকের ভিত্তি জানিয়ে হলফনামা এবং মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারকে দশ দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী শুনানি ৮ অক্টোবর।
দেজিনার কথায়, স্বামীই ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাঁদের তিন সন্তান রয়েছে। বাবার অনুপস্থিতিতে ছোট দুই ছেলে স্কুলে যেতে চাইছে না, খাওয়াদাওয়াও করছে না ঠিকমতো। সাম্প্রতিক বন্যায় চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সংসারের আর্থিক দুরবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
এই মামলায় দুটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা প্রয়োজন: একজনের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশাসনের সন্দেহ এবং তাঁকে আটক রাখার পদ্ধতি। প্রথমটির নিষ্পত্তির জন্য পরিচয় ও পারিবারিক ইতিহাসসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা প্রয়োজন। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল, কোন ক্ষমতাবলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কীভাবে সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিচয়পত্র নিয়ে বিতর্কেও একটি পার্থক্য জরুরি। আধার পরিচয় যাচাইয়ের নথি হলেও নিজে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত মামলাতেও সুপ্রিম কোর্ট আধারকে একমাত্র নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার যুক্তি মানেনি। অর্থাৎ, নথি থাকার দাবি এবং নাগরিকত্বের আইনগত নির্ধারণকে একই বিষয় ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে এই পার্থক্য থেকে উল্টো সিদ্ধান্তও টানা চলে না: কারও নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ উঠলেই তাঁর দেওয়া সমস্ত নথি মূল্যহীন হয়ে যায় না। কোন নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, সেই প্রশ্নের ভিত্তি কী এবং জবাব দেওয়ার সুযোগ কতটা কার্যকর, তা যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহ, অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে ব্যবধান বজায় রাখা প্রয়োজন।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিপুল সংখ্যক আপিল বিচারাধীন। নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, বিচারিক যাচাইয়ে বাদ পড়া ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২২.২১ লক্ষ নাম ফেরানোর আবেদন করেছেন। মোট ৩৮.৩১ লক্ষ আপিলের বাকি ১৬.১০ লক্ষ তালিকায় থাকা নাম বাদ দেওয়ার দাবি।
আগের পৃথক হলফনামায় কমিশন জানিয়েছিল, ৩৮,২০,৬৮৩টি আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১,০২,২৩১টির। বকেয়া ছিল ৩৭,১৮,৪৫২টি। এই সামগ্রিক পরিসংখ্যান সাহিদুলের নাগরিকত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ নয়। তবে নথি যাচাই, আপত্তি এবং প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যে কেন এত উদ্বেগ, তার প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করে।
কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যথার্থতা বুঝতে শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়; সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পথটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। ব্যক্তির বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট নথি এবং সরকারি যুক্তি একসঙ্গে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকলেই বিরোধের নির্ভরযোগ্য নিষ্পত্তি সম্ভব। নাগরিক পরিচয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দ্রুততা ও সতর্কতা পরস্পরের বিকল্প হতে পারে না। ভুল শনাক্তকরণের ক্ষতি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের স্বাধীনতা, জীবিকা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎকেও সরাসরি বিপন্ন করে তুলতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



