খবর

লাঠি নয়, কথায় থামল পাঁচ হাজার জনতা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • রেললাইনের উপর বসে প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুব্ধ যাত্রী।
  • ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ মারমুখী; সামান্য উসকানিতেই পরিস্থিতি গড়াতে পারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে।
  • ঠিক সেই সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন মাত্র ২৬ বছরের এক তরুণী আইপিএস আধিকারিক—শ্রীদেবী গোয়েল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

রেললাইনের উপর বসে প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুব্ধ যাত্রী। ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। উত্তেজনা বাড়ছে প্রতি মুহূর্তে। ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ মারমুখী; সামান্য উসকানিতেই পরিস্থিতি গড়াতে পারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে।

ঠিক সেই সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন মাত্র ২৬ বছরের এক তরুণী আইপিএস আধিকারিক—শ্রীদেবী গোয়েল।

সামনে ছিল চেনা পথ। পুলিশ বাহিনী নামিয়ে লাঠিচার্জ করে রেললাইন খালি করা। অথবা আরও কঠিন পথ—ক্ষুব্ধ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের কথা শোনা, সমস্যার কারণ বোঝা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা।

শ্রীদেবী দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।

জাসরিন মায়াল খন্নার বুলেট নানি অ্যান্ড আদার ব্যাডঅ্যাস ইন্ডিয়ান গ্র্যান্ডমাস বইয়ে উঠে এসেছে সেই ঘটনার বিবরণ। বইটির নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করেছে দ্য হিন্দু। ঘটনাটি নিছক এক তরুণ পুলিশকর্তার সাহসিকতার গল্প নয়; এটি দেখায়, হাতে অস্ত্র থাকা মানেই বলপ্রয়োগ করতে হবে—প্রশাসনিক নেতৃত্বের অর্থ তা নয়।

শ্রীদেবী গোয়েল ছিলেন ১৯৭৭ সালের আইপিএস ব্যাচের আধিকারিক এবং মহারাষ্ট্রের প্রথম দিককার মহিলা পুলিশকর্তাদের অন্যতম। কর্মজীবনের একেবারে গোড়াতেই তাঁকে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কয়েক হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারত।

রেল কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন যাত্রীরা। শেষ পর্যন্ত তাঁরা রেললাইনে নেমে বসে পড়েন। ট্রেন দাঁড়িয়ে যায়, রেল যোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামলানোর বদলে সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টার প্রথমে অনমনীয় অবস্থান নিয়েছিলেন। ফলে ক্ষোভ আরও বাড়ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রচলিত পদ্ধতি খুব পরিচিত—সতর্কবার্তা, তারপর প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ। কিন্তু কয়েক হাজার মানুষকে লক্ষ্য করে লাঠিচার্জ শুরু হলে পদপিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল প্রবল। পাল্টা হামলা হতে পারত। ক্ষতি হতে পারত রেলের সম্পত্তি, দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের জীবন।

শ্রীদেবী বুঝেছিলেন, জনতাকে ‘শত্রু’ হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

তাই তিনি প্রথমে কথা বলতে শুরু করলেন।

যাত্রীদের অভিযোগ শুনলেন। তাঁদের ক্ষোভের আসল কারণ বোঝার চেষ্টা করলেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানালেন, রেললাইনে বসে থাকা তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক এবং আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু তাঁর কথায় ছিল না হুমকির সুর।

ছিল দৃঢ়তা।

এর পর তিনি কথা বললেন স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে। যাত্রীদের দাবি সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতাও তিনি মেনে নেননি। বরং প্রযোজ্য আইন এবং রেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের কথা তুলে ধরলেন। শেষ পর্যন্ত স্টেশন মাস্টারকেও নিজের অবস্থান বদলাতে হয়।

অর্থাৎ শ্রীদেবী শুধু জনতাকে আইন মানতে বলেননি। প্রশাসনের অন্য প্রান্তকেও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন—আইন সবার জন্যই।

এই জায়গাটিই সম্ভবত তাঁর কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

যাত্রীরা যখন দেখলেন, তাঁদের কথা শোনা হচ্ছে এবং পুলিশ আধিকারিক একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছ থেকেও জবাব চাইছেন, তখন পরিস্থিতির উত্তাপ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হল সমাধানের রাস্তা।

প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ শেষ পর্যন্ত রেললাইন ছেড়ে সরে গেলেন।

কোনও লাঠিচার্জ হয়নি। কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার প্রয়োজন পড়েনি। কাউকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠাতেও হয়নি।

যে জমায়েত কয়েক মিনিটের মধ্যে দাঙ্গায় পরিণত হতে পারত, তা শেষ হল কথোপকথনের মাধ্যমে।

পরে নিজের দীর্ঘ পুলিশজীবনের কথা বলতে গিয়ে শ্রীদেবী জানিয়েছিলেন, কর্মক্ষেত্রে তিনি কখনও ভয় পাননি। তাঁর সাহস অবশ্য বেপরোয়া বলপ্রয়োগের সাহস ছিল না। বরং বিপদের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখা, মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা, আইন জানা এবং প্রশাসনের দুই প্রান্তকেই দায়িত্বশীল করে তোলাই ছিল তাঁর শক্তি।

প্রায় ৩৮ বছরের কর্মজীবনে শ্রীদেবী মহারাষ্ট্রের হোম গার্ডসের মহানির্দেশক পদে পৌঁছেছিলেন। অপরাধ তদন্ত, নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ এবং পুলিশ প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

একসময় তাঁর উর্দি পরা ছবি ধর্মযুগ পত্রিকার প্রচ্ছদেও প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ বহু বছর পর সেই ছবিই পুলিশের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠীতে ঘুরে বেড়ালেও ছবির মহিলা আধিকারিককে প্রায় কেউ চিনতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরাই তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন।

জাসরিন মায়াল খন্নার বুলেট নানি বইয়ে এমনই বারো জন ভারতীয় নারীর জীবন উঠে এসেছে—চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, পুলিশকর্তা, উদ্যোগপতি, সমরকলা প্রশিক্ষক থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমের স্রষ্টা। তাঁদের অনেকের অবদানই মূলধারার ইতিহাসে যথেষ্ট জায়গা পায়নি।

শ্রীদেবীর গল্পও সেই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

কারণ পাঁচ হাজার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার গল্পটি শেষ পর্যন্ত পুলিশের ক্ষমতার গল্প নয়। এটি নেতৃত্বের গল্প।

রাষ্ট্রের হাতে লাঠি আছে, বন্দুক আছে, আইন আছে। কিন্তু প্রতিটি সংকটে সেগুলিই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র নয়।

কখনও পাঁচ হাজার ক্ষুব্ধ মানুষকে থামাতে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে—শান্ত মাথা, আইনের জ্ঞান এবং কথা বলার সাহস।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles