International

‘শত্রু চিনুন’, বার্তা খামেনেইয়ের

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেইয়ের বার্তা স্পষ্ট—‘প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করুন, তার পরিকল্পনা বুঝুন, তারপর একজোট হয়ে মোকাবিলা করুন।’ পশ্চিম এশিয়া, বিশেষত পারস্য উপসাগরীয়…
  • তাঁর কথায়, মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক বিভাজনই বিদেশি শক্তিকে এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে।
  • আর সেই ‘প্রকৃত শত্রু’ বলতে তিনি সরাসরি আমেরিকা ও ইজরায়েলকেই বোঝাচ্ছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেইয়ের বার্তা স্পষ্ট—‘প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করুন, তার পরিকল্পনা বুঝুন, তারপর একজোট হয়ে মোকাবিলা করুন।’ পশ্চিম এশিয়া, বিশেষত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির উদ্দেশে ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া লিখিত বার্তায় তিনি এই আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক বিভাজনই বিদেশি শক্তিকে এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে। আর সেই ‘প্রকৃত শত্রু’ বলতে তিনি সরাসরি আমেরিকা ও ইজরায়েলকেই বোঝাচ্ছেন।

ছ’মাস আগে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর বাবা তথা ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর মোজতবা সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। ওই হামলায় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অবশ্য তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ইরানি কর্তৃপক্ষও তাঁর নতুন কোনও দৃশ্য বা কণ্ঠবার্তা প্রকাশ করেনি। ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা অব্যাহত। এই আবহে তাঁর নামে প্রকাশিত লিখিত বার্তাটি তাই নিছক ধর্মীয় আহ্বান নয়; এর মধ্যে নিজের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের বার্তা প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক তাগিদও দেখছেন অনেকে।

মুসলিম বিশ্বের দুর্বলতার জন্য নিজেদের মধ্যেকার বিভাজনকেই দায়ী করেছেন মোজতবা। তাঁর প্রশ্ন, মুসলিম দেশগুলি সত্যিই ঐক্যবদ্ধ থাকলে প্যালেস্তাইনের মানুষকে কি এতটা দুর্ভোগ পোহাতে হত? বিদেশি শক্তি কি এত সহজে মুসলিম ভূখণ্ডে সামরিক হস্তক্ষেপ চালাতে পারত?

তাঁর বক্তব্য, একটি মুসলিম দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশের নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা, সমন্বয় এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের কাঠামো।

বিশেষ নজর অবশ্য উপসাগরীয় দেশগুলির দিকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও ওমান—দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। এই দেশগুলির কয়েকটিতে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও। তেহরানের অভিযোগ, ওই সামরিক পরিকাঠামো ব্যবহার করেই আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।

তাই মোজতবার বার্তার অন্তর্নিহিত সুরটিও বেশ স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা-ছাতার নীচে থাকলেই উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলি যে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

তবে ‘ঐক্য’-র ডাকের আড়ালে রয়েছে চাপের সুরও। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় কোনও দেশ সহযোগিতা করলে তার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি তেহরান আগেই দিয়েছে। নতুন করে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের পর সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এরই মধ্যে ইরানি নেতৃত্বের একাংশ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ ব্যাহত করার হুমকিও দিয়েছে।

ফলে ‘প্রকৃত শত্রুকে চিনুন’—এই বার্তা একই সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আবেদন এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ। বার্তার অর্থ যেন এমন—শত্রু কে, সেটি ঠিক করে নিন; নইলে আপনার নিরাপত্তার হিসাবও বদলে যেতে পারে।

মোজতবা অবশ্য শুধু রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সহযোগিতার কথাই বলেননি। মুসলিম সমাজের ভিতরে বিভাজন বাড়ায়—এমন বক্তৃতা ও কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা রাজনৈতিক বিভেদ যত গভীর হবে, বহিরাগত শক্তির পক্ষে পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার তত সহজ হবে—এমনই তাঁর যুক্তি।

কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলি তাঁর ডাকে কতটা সাড়া দেবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সশস্ত্র মিত্রগোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে আরব রাজতন্ত্রগুলির দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে আমেরিকার সহযোগী দেশগুলির পরিকাঠামোয় ইরানি হামলার ঘটনাও সেই অবিশ্বাস আরও গভীর করেছে।

অর্থাৎ তেহরানের কাছে ‘প্রকৃত শত্রু’ আমেরিকা ও ইজরায়েল হলেও উপসাগরীয় বহু সরকারের নিরাপত্তা-সমীকরণে ইরান নিজেই বড় ঝুঁকি।

এখানেই মোজতবার আহ্বানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মুসলিম ঐক্যের ভাষায় লেখা হলেও তাঁর বার্তার লক্ষ্য যে শুধু ধর্মীয় সংহতি নয়, তা স্পষ্ট। তিনি আসলে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা-সমীকরণ পাল্টাতে চাইছেন—আরব রাষ্ট্রগুলিকে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে তেহরানকেন্দ্রিক প্রতিরোধের বলয়ে টানতে চাইছেন।

কিন্তু যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অবিশ্বাস আর পাল্টা হামলায় যখন গোটা অঞ্চল উত্তপ্ত, তখন মোজতবার ‘ঐক্যের ডাক’ কতটা সেতু তৈরি করবে, আর কতটা নতুন বিভাজনের রেখা টানবে—সেটাই এখন দেখার।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles