বাংলাস্ফিয়ার: ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি দমন-পীড়নকে কেন্দ্র করে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপে ফেলতে নতুন কৌশল নিয়েছে বিরোধী শিবির। শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরেও আন্দোলনের মূল প্রশ্নগুলির সমাধান হয়নি বলে দাবি করে এবার বিরোধীরা সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করেছে। তাদের অভিযোগ, দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং সেই ঘটনার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি এড়ানো চলবে না।
সূত্রের খবর, সংসদের দুই কক্ষেই বিরোধী সাংসদরা মুলতবি প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য, ছাত্র আন্দোলনের সময় দিল্লি পুলিশের ভূমিকা, লাঠিচার্জ, আটক, আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা এবং গোটা ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা বাধ্যতামূলক করা। যেহেতু দিল্লি পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে কাজ করে, তাই বিরোধীদের বক্তব্য— এই ঘটনার রাজনৈতিক জবাব দিতে হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই।
এদিকে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি লিখে ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চিঠিতে তিনি আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, আহতদের চিকিৎসা, আটক ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা এবং পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের পরিবেশ তৈরিরও আহ্বান জানিয়েছেন।
বিরোধী জোটের নেতাদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট এখন আর শুধুমাত্র প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষা বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারের সমালোচনা করলেই ছাত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে— এমন ধারণা তৈরি হলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হবে। সেই কারণেই সংসদের ভেতরে বিষয়টিকে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিরোধী শিবিরের কৌশল হল, শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগকে সরকারের রাজনৈতিক দায় স্বীকারের প্রথম ধাপ হিসেবে তুলে ধরে পরবর্তী প্রশ্নগুলিতে সরকারকে ক্রমাগত চাপে রাখা। তাদের বক্তব্য, যদি সরকার সত্যিই শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার চায়, তবে আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির পর্যালোচনা, পুলিশি ব্যবহারের তদন্ত এবং ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষের দাবি, বিরোধীরা একটি শিক্ষাগত সমস্যাকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করছে। বিজেপির নেতাদের বক্তব্য, সরকার ইতিমধ্যেই কঠোর আইন, দ্রুত বিচার, প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিটি গঠনের মতো একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। তাদের মতে, সংসদের আলোচনা হওয়া উচিত ভবিষ্যতের সংস্কার নিয়ে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়।
তবে বিরোধীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, সংস্কারের ঘোষণা যতই হোক, আন্দোলনের সময় যা ঘটেছে তার জবাব সরকারকে দিতেই হবে। সংসদে বিষয়টি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না হলে তারা ওয়াকআউট, বিক্ষোভ এবং অন্যান্য সংসদীয় কৌশলও গ্রহণ করতে পারেন বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সরকার ভেবেছিল বিতর্ক কিছুটা প্রশমিত হবে। কিন্তু বিরোধীরা এখন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুকে শিক্ষা মন্ত্রক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দিকে সরিয়ে এনে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে। ফলে বর্ষাকালীন অধিবেশনের আগামী কয়েকটি দিনেও ছাত্র আন্দোলন, পুলিশি দমন এবং সরকারের জবাবদিহি— এই তিনটি বিষয়ই সংসদের প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠতে পারে।