শুক্রবার, ২১ আগস্ট যন্তর মন্তরে ‘রিজার্ভেশন হটাও আন্দোলন’ বা ‘সংরক্ষণ হটাও আন্দোলন’-এর কোনও জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হয়নি—বৃহস্পতিবার স্পষ্ট জানিয়ে দিল দিল্লি পুলিশ। আন্দোলনের অনুমতি মিলেছে বলে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বার্তা ও ভিডিয়োগুলিকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বলেও চিহ্নিত করেছে পুলিশ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ জমায়েত করলে কিংবা ভুয়ো তথ্য ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

‘রিজার্ভেশন হটাও আন্দোলন’ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম পাতা থেকে ২১ আগস্ট যন্তর মন্তরে সংরক্ষণ-বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কয়েকটি সমাজমাধ্যমের পোস্টে আবার দাবি করা হয়, দিল্লি পুলিশ এই কর্মসূচির অনুমতি দিয়েছে। সেই দাবিই নস্যাৎ করে পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই দিন সংরক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কার বা বিলোপের দাবিতে কোনও সংগঠনকেই যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, নয়াদিল্লি জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে। এই ধারাটি পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার সমতুল। নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী প্রতিবাদ-মিছিল, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ এবং পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত করা যাবে না। ফলে সমাজমাধ্যমের আহ্বান দেখে মানুষ যেন যন্তর মন্তরে না যান, সেই পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে যাচাই না-করা কোনও ভিডিয়ো বা বার্তা প্রচার কিংবা অন্যকে পাঠানো থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “নাগরিকদের সমাজমাধ্যমে প্রচারিত যাচাই না-করা বিষয়বস্তু ছড়ানো বা ভাগ করে নেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভুয়ো খবর তৈরি অথবা প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।” শুক্রবার যন্তর মন্তর ও সংলগ্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রের ইঙ্গিত।

‘সংরক্ষণ হটাও আন্দোলন’ প্রথমে মূলত সমাজমাধ্যমনির্ভর প্রচার হিসাবেই আত্মপ্রকাশ করে।  জুলাইয়ের শেষ নাগাদ ‘reservationhataomovement’ নামের ইনস্টাগ্রাম পাতাটির অনুসরণকারীর সংখ্যা ৫৫ লক্ষ ছাড়িয়েছিল। সেখানে নিজেদের কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন, নাগরিক-সমর্থিত আন্দোলন বলে দাবি করা হয়। তবে এই পাতার প্রতিষ্ঠাতা বা পরিচালকের পরিচয় প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।

পাতাটির পরিচিতিতে বি আর আম্বেদকরের ‘শিক্ষিত হও, আন্দোলিত হও, সংগঠিত হও’ আহ্বানের পাশাপাশি সব জাতিকে সমান বলে ঘোষণাও রয়েছে। তাদের বক্তব্য, বর্তমান জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা মেধা ও প্রতিযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং জাতিগত বিভাজনকে আরও স্থায়ী করে তুলছে। সুযোগ বণ্টনের ক্ষেত্রে জাতির পরিবর্তে আর্থিক অবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি তুলেছে তারা।

অন্য দিকে, সংরক্ষণের সমর্থকেরা বরাবরই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে এটি নিছক দারিদ্র্য দূর করার প্রকল্প নয়; শতাব্দীব্যাপী সামাজিক বৈষম্য, বঞ্চনা ও প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি মোকাবিলার সাংবিধানিক ব্যবস্থা। ফলে সংরক্ষণ বিলোপের দাবি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এই দাবিকে ঘিরে অনলাইন প্রচার বাস্তব জমায়েতে রূপ নিলে পাল্টা আন্দোলন বা উত্তেজনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অভিজিৎ দীপকের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রচারের ধাঁচ অনুসরণ করেই ‘সংরক্ষণ হটাও আন্দোলন’ দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সিজেপি-র পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়মবিরোধী প্রচার প্রথমে সমাজমাধ্যমে শুরু হলেও পরে তা যন্তর মন্তরে বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর অনলাইন আহ্বানগুলিকে প্রশাসন আরও গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে ‘সংরক্ষণ হটাও আন্দোলন’-এর সঙ্গে গায়ক স্যান্টি শর্মার ‘রিজার্ভেশন হটাও—আগস্ট ক্রান্তি’ অভিযানের সাংগঠনিক সম্পর্ক স্পষ্ট নয়। শর্মার অভিযানে সংরক্ষণের সম্পূর্ণ বিলোপের পরিবর্তে আর্থিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার, জাতিবৈষম্যের অবসান এবং প্রতিবন্ধী ও প্রকৃত অভাবীদের জন্য সহায়তার কথা বলা হয়েছিল। ফলে একই ধরনের নাম ব্যবহার করা হলেও বিভিন্ন প্রচারকে এক সংগঠন বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।

আপাতত পুলিশের বক্তব্য দ্ব্যর্থহীন—শুক্রবার যন্তর মন্তরে ঘোষিত কর্মসূচিটি অনুমোদিত নয়। অনুমতি পাওয়া গিয়েছে বলে ছড়ানো দাবির ভিত্তিতে কেউ সেখানে উপস্থিত হলে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এখন নজর থাকবে, আয়োজকেরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন, স্থান বদলান, না কি পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই জমায়েতের চেষ্টা করেন।