বাংলাস্ফিয়ার: ছাত্র আন্দোলনের সময় কিছু বিক্ষোভকারীর মুখে শোনা যাওয়া আপত্তিকর ও অশালীন স্লোগানকে কেন্দ্র করে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে, তখন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনও ব্যক্তি অপমানিত বোধ করলে তিনি মানহানির মামলা করতে পারেন, কিন্তু শুধুমাত্র আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে ফৌজদারি আইন প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়।
বার্তা সংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৌরভ দাস বলেন, সিজেপি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারে বিশ্বাস করে। আন্দোলনের সময় কোনও ব্যক্তি যদি আপত্তিকর বা অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করে থাকেন, তবে তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মানহানির মামলা করা যেতে পারে। তবে সেই ঘটনাকে অজুহাত করে বৃহত্তর আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করবে।
দাসের বক্তব্য, “যদি কোনও ভাষা সত্যিই অবমাননাকর হয়ে থাকে, তাহলে যিনি অপমানিত বোধ করেছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মানহানির মামলা করতে পারেন। কিন্তু শুধু আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইন প্রয়োগ করা উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে এ ধরনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা। এর ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মানুষ ভবিষ্যতে সরকারের সমালোচনা বা প্রতিবাদ জানাতে ভয় পাবেন। তাঁর ভাষায়, “এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর ‘চিলিং এফেক্ট’ তৈরি হবে।”
সৌরভ দাস অবশ্য একইসঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, সিজেপি কোনওভাবেই অশালীন বা অবমাননাকর ভাষার সমর্থন করে না। তিনি বলেন, কোনও আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিলে প্রত্যেকের বক্তব্য বা আচরণের জন্য সংগঠনকে দায়ী করা যায় না। যদি কোনও ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করে থাকেন, তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব নির্ধারণ করা উচিত, কিন্তু সেই ঘটনাকে সামনে রেখে গোটা আন্দোলনকে অপরাধী হিসেবে দেখানো উচিত নয়।
সম্প্রতি প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে কিছু আপত্তিকর স্লোগান ও মন্তব্য সামনে আসে। সেই ঘটনাকে ঘিরে শাসক দল আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলে। অন্যদিকে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ, আন্দোলনের মূল ইস্যু থেকে নজর ঘোরাতেই এই বিতর্ককে বড় করে দেখা হচ্ছে।
সিজেপি-র বক্তব্য, প্রতিবাদের সময় ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তার জেরে ফৌজদারি মামলা, গ্রেফতার বা কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সংগঠনের দাবি, আইন যদি প্রয়োগ করতেই হয়, তবে তা নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত মানহানি আইনের আওতায় হওয়া উচিত, প্রতিবাদের অধিকারের বিরুদ্ধে নয়।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন প্রশ্নফাঁস ইস্যু, ছাত্র আন্দোলন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত। সিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, গণতন্ত্রে তীব্র সমালোচনা, কটাক্ষ বা বিতর্কিত মন্তব্যের জবাব রাজনৈতিক ও আইনি পথে দেওয়া উচিত, কিন্তু ভিন্নমত দমনে ফৌজদারি আইনকে হাতিয়ার করা উচিত নয়।
সৌরভ দাসের এই মন্তব্য নতুন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং মানহানি আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। একদিকে বিরোধীদের দাবি, কঠোর দমননীতি গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করছে; অন্যদিকে শাসক শিবিরের বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা কোনওভাবেই গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অংশ হতে পারে না। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি—উভয় ক্ষেত্রেই আগামী দিনে আরও আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে।