Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক সপ্তাহে যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। একের পর এক নেতা, বিধায়ক ও সাংসদের বিদ্রোহ, সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন — সব মিলিয়ে দলের সামনে তৈরি হয়েছে কঠিন পরিস্থিতি। এই আবহেই দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বৈঠক কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। বরং এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা। কারণ গত কয়েক বছরে কংগ্রেস ও তৃণমূলের সম্পর্ক কখনও উষ্ণ, কখনও শীতল থেকেছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে দুই দলের সংঘাত বহুবার জাতীয় স্তরের বিরোধী ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের সময়েই দিল্লি অভিযান
তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। দলের বহু নেতা প্রকাশ্যে নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন। বিধায়কদের একাংশ আলাদা অবস্থান নিয়েছেন। সাংগঠনিক স্তরেও অস্বস্তি স্পষ্ট। এমন অবস্থায় অভিষেকের দিল্লি সফর এবং রাহুলের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, অভিষেক বুঝতে পেরেছেন যে একা লড়াই করে এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষত যদি সংসদে বা জাতীয় রাজনীতিতে দল আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সেই কারণেই বিরোধী শিবিরের বৃহত্তম শক্তিগুলির একটির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ রাহুল-অভিষেক বৈঠক?
একটা সময় ছিল যখন কংগ্রেস ও তৃণমূল একই রাজনৈতিক পরিবারের অংশ। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে নিজস্ব দল গড়েন। সেই থেকে সম্পর্কের ওঠানামা চলছেই। জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির প্রয়োজনে দুই দল বহুবার একসঙ্গে এসেছে। আবার পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছে। ফলে দুই দলের সম্পর্ক বরাবরই ছিল ‘প্রয়োজনের বন্ধুত্ব’।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দলের ভেতরে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন সময় কংগ্রেসের সমর্থন বা অন্তত সহানুভূতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে অভিষেক সম্ভবত সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে তৃণমূল এখনও বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতির অংশ এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়।
কংগ্রেস কী লাভ দেখতে পারে?
এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কংগ্রেসও বর্তমানে নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পর দলটি আবার রাজনৈতিক জমি ফিরে পেতে চাইছে। তৃণমূলের দুর্বলতা কংগ্রেসের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্য গড়ার প্রয়োজনও রয়েছে।
ফলে কংগ্রেসের সামনে দ্বৈত সমীকরণ — একদিকে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের শক্তি বাড়ানো, অন্যদিকে জাতীয় স্তরে বিরোধী জোটকে কার্যকর রাখা। অভিষেকের সঙ্গে আলোচনায় এই দুই বিষয়ই উঠে এসেছে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।
মমতার নীরব সম্মতি?
রাজনীতিতে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সাধারণত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়া হয় না। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এই উদ্যোগের পিছনে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীরব সম্মতি রয়েছে। মমতা অতীতেও সংকটের সময় কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ককে সম্পূর্ণ ছিন্ন করেননি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে দলকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে না দেওয়া। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অভিষেককে সামনে রেখে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংসদ না কি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা?
বৈঠকের পর স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা শুরু হয়েছে — এটি কি কেবল সংসদীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক পরিকল্পনা? বর্তমানে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলগুলির যৌথ অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংসদে সরকারকে চাপে রাখতে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেও এই বৈঠক হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বিষয়টি তার চেয়েও বড়। কারণ তৃণমূল যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক সংকটের মুখে পড়ে, তাহলে জাতীয় স্তরে নতুন মিত্রতার প্রয়োজন হতে পারে। সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সামনে কোন পথ?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে তৃণমূলের সংকট মিটিয়ে দেবে এমন দাবি কেউ করছেন না। দলের ভেতরের অসন্তোষ, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে। তবে এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে — তৃণমূল বুঝতে পারছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল আক্রমণাত্মক রাজনীতি যথেষ্ট নয়; দরকার সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক সেতুবন্ধন।
দিল্লিতে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে অভিষেকের বৈঠক তাই নিছক একটি সাক্ষাৎ নয়। এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন তৃণমূল নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে। সেই কারণেই এই বৈঠককে অনেকেই দেখছেন সংকট মোকাবিলার প্রথম বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে কংগ্রেস-তৃণমূল সম্পর্ক কোন দিকে যায়, বিদ্রোহী নেতাদের অবস্থান কী হয় এবং দলের অভ্যন্তরীণ সংকট কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে সেই উত্তরই ঠিক করে দেবে এই বৈঠক ইতিহাসে কেবল একটি ছবি হয়ে থাকবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে উঠবে।