বাংলাস্ফিয়ার: লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়েছে। বিজেপি সাংসদ অনুরাগ ঠাকুর বৃহস্পতিবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে বিশেষাধিকার লঙ্ঘনের নোটিস জমা দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সংসদে বিতর্ক চলাকালীন রাহুল গান্ধী আপত্তিকর, অশালীন ও অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ ছাড়াই গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

তিন পাতার ওই নোটিসে অনুরাগ ঠাকুর দাবি করেছেন, বিষয়টি লোকসভার বিধি অনুযায়ী বিশেষাধিকার কমিটির কাছে পাঠানো হোক। পাশাপাশি রাহুল গান্ধীকে সংসদ এবং অমিত শাহ—উভয়ের কাছেই নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দেওয়ার আবেদনও জানিয়েছেন।

কী অভিযোগ বিজেপির?

অনুরাগ ঠাকুরের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ২৯ জুলাই লোকসভায় জনপরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস রোধ সংক্রান্ত সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনায় রাহুল গান্ধীর বক্তব্য। সেই বিতর্কে রাহুল প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সেই সময় তিনি কয়েকটি মন্তব্য করেন, যা বিজেপির দাবি অনুযায়ী সংসদীয় শালীনতার পরিপন্থী।

বিশেষ করে, ছাত্রদের উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে রাহুল গান্ধী ‘ইডিয়টস’ এবং ‘অন্ধভক্ত’ শব্দ ব্যবহার করেন। বিজেপির অভিযোগ, এই ধরনের ভাষা সংসদের মর্যাদার সঙ্গে অসঙ্গত। একই সঙ্গে তিনি অমিত শাহের ভূমিকা নিয়ে এমন অভিযোগ করেছেন, যার পক্ষে কোনও তথ্য বা প্রমাণ সংসদে পেশ করা হয়নি।

কোন নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ?

বিশেষাধিকার নোটিসে অনুরাগ ঠাকুর উল্লেখ করেছেন যে রাহুল গান্ধী লোকসভার কার্যপ্রণালি ও কার্যবিধির ৩৫২ নম্বর বিধি লঙ্ঘন করেছেন। এই বিধি অনুযায়ী, কোনও সদস্য সংসদে এমন অভিযোগ করতে পারেন না যার পক্ষে পর্যাপ্ত ভিত্তি বা প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রমণ, মানহানিকর বা অশালীন মন্তব্য থেকেও সদস্যদের বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে।

এছাড়া তিনি ২২৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী বিষয়টি বিশেষাধিকার কমিটির কাছে পাঠানোর আবেদন করেছেন। এই কমিটি তদন্ত করে স্পিকারকে সুপারিশ জানাতে পারে। প্রয়োজনে ক্ষমা প্রার্থনা, সতর্কবার্তা বা অন্য সংসদীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়।

প্রশ্নফাঁস বিতর্কে উত্তপ্ত লোকসভা

প্রশ্নফাঁস রোধে সংশোধনী বিল নিয়ে লোকসভায় আলোচনার সময় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ হয়। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, পরপর প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং সরকারের জবাবদিহির অভাব রয়েছে।

রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ছাত্ররা সরকারের প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সেই প্রসঙ্গেই তিনি বিতর্কিত শব্দগুলি ব্যবহার করেন বলে বিজেপির অভিযোগ।

অন্যদিকে সরকার পক্ষের বক্তব্য, বিরোধী দলনেতা সংসদের ভিতরে এমন ভাষা ব্যবহার করে শুধু সংসদের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ করেননি, বরং প্রমাণ ছাড়া একজন সাংবিধানিক পদাধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে সংসদীয় রীতিনীতিও ভঙ্গ করেছেন।

বিশেষাধিকার লঙ্ঘন কী?

সংসদের সদস্যদের কিছু বিশেষ অধিকার ও মর্যাদা রয়েছে, যাতে তাঁরা স্বাধীনভাবে বক্তব্য রাখতে পারেন। কিন্তু সেই অধিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়। কোনও সদস্য যদি সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন, অসংসদীয় আচরণ করেন বা বিধিভঙ্গ করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা যেতে পারে।

তবে এমন নোটিস জমা পড়লেই যে তা গ্রহণ করা হবে, এমন নয়। প্রথমে স্পিকার সিদ্ধান্ত নেন অভিযোগটি গ্রহণযোগ্য কি না। গ্রহণযোগ্য মনে হলে বিষয়টি বিশেষাধিকার কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হয়।

রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়ার সম্ভাবনা

এই নোটিসকে কেন্দ্র করে সংসদের অচলাবস্থা আরও বাড়তে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। একদিকে বিজেপি রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলেছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের বক্তব্য, প্রশ্নফাঁস, ছাত্র আন্দোলন এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে মূল বিতর্ক থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই এই ইস্যুকে সামনে আনা হচ্ছে।

আগামী দিনে স্পিকার এই নোটিস গ্রহণ করেন কি না এবং বিষয়টি বিশেষাধিকার কমিটির কাছে পাঠানো হয় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে এই বিতর্কের পরবর্তী রাজনৈতিক ও সংসদীয় গতিপ্রকৃতি।