হাইলাইটস:

  • সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগে সোনম ওয়াংচুক ইস্যুতে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ।
  • অনশনস্থল যন্তর মন্তর থেকে সাফদরজং হাসপাতালে সরানো নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র দমনের অভিযোগ।
  • সোমবার থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনে এই ইস্যুতে সরকারকে কোণঠাসা করার প্রস্তুতি বিরোধী শিবিরের।
  • বিজেপির পাল্টা দাবি, দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ ও চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনেই ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক আগে সোনম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তরের অনশনমঞ্চ থেকে সাফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হল বিরোধী শিবির। শনিবার একাধিক বিরোধী দলের নেতা এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন এবং স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, সোমবার থেকে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে।

গত ২৮ জুন থেকে সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করেন। ককরোচ জনতা পার্টির উদ্যোগে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুনরাবৃত্তির দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এই অধিবেশন বিরোধীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গত এপ্রিলে সংসদের আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল আটকে দিতে বিরোধীরা একজোট হলেও, তার পর থেকেই বিরোধী জোটে বড় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিরোধী শিবিরের চারটি দল থেকে মোট ৩৭ জন লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদ শাসকপক্ষের দিকে চলে গিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে দলত্যাগবিরোধী আইন কার্যকর হওয়ার পর এটিই সংসদে সবচেয়ে বড় দলবদলের ঘটনা বলে দাবি করা হচ্ছে। সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ কোয়েল মল্লিকও পদত্যাগ করেছেন।

এমন পরিস্থিতিতে বিরোধীদের আশা, সোনম ওয়াংচুক ইস্যু অন্তত প্রাথমিকভাবে সব বিরোধী দলকে একই মঞ্চে আনতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে সরকার যদি আবারও মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করতে সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল এবং লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস বিল সংসদে আনে, তাহলে যৌথ কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে বিরোধী শিবির।

তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তরের পর আন্দোলনের নেতৃত্ব এখন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের হাতে চলে যাওয়ায় এই ইস্যু কতদিন বিরোধীদের একত্রে ধরে রাখতে পারবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কংগ্রেস প্রথমদিকে এই আন্দোলন নিয়ে বিশেষ সক্রিয় ছিল না। কারণ, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং ছাত্রদের আত্মহত্যার বিষয়গুলি নিয়ে প্রচার চালিয়ে আসছেন। তবে দলের প্রবীণ নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর পরামর্শের পর কংগ্রেস অবস্থান বদলায়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে লেহ গিয়ে সোনম ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংয়ালের অনশন ভাঙানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

এরপর কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল বিবৃতি দেন এবং রাজ্যসভার সাংসদ পবন খেরা যন্তর মন্তরে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন।

শনিবার অবশেষে নীরবতা ভাঙেন রাহুল গান্ধীও। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “মোদী সরকারের মূল ভিত্তি অসত্য ও হিংসা। অহিংস অনশনে বসে থাকা সোনম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে দেওয়া ভুল হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ছাত্রদের আত্মহত্যা দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত গুরুতর বিষয়। বলপ্রয়োগ করে ছাত্রদের কণ্ঠস্বর কখনও স্তব্ধ করা যাবে না।”

এদিকে, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদ পওয়ার গোষ্ঠী)-র প্রধান শরদ পওয়ারও সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েই ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তর করেছে। তাঁর অভিযোগ, টানা ২০ দিন অনশন চললেও সরকারের কোনও মন্ত্রী ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করতে যাননি বা আলোচনার উদ্যোগ নেননি।

আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, “বলপ্রয়োগ করে সোনম ওয়াংচুককে সরিয়ে দেওয়ার বদলে সরকারের উচিত ছিল তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিকে দমন করার চেষ্টা করছে কেন্দ্র।”

তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সোনম ওয়াংচুক শুধু আলোচনার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আবেদনকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ উপেক্ষা করা হয়েছে। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাব সংলাপের মাধ্যমে দেওয়া উচিত, নীরবতার মাধ্যমে নয়।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের অসংখ্য তরুণের কণ্ঠস্বরের মতোই ওয়াংচুকের কণ্ঠও উপেক্ষিত হয়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সম্মান ছাড়া মানুষের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়।”

শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)-র নেতা আদিত্য ঠাকরে এই ঘটনাকে “গণতন্ত্রের ওপর আঘাত” বলে অভিহিত করেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে গঙ্গা আন্দোলনে অধ্যাপক জি ডি আগরওয়ালের অনশন, যন্তর মন্তরে কুস্তিগীরদের আন্দোলন এবং কৃষক আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতার অভিযোগ তোলেন।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব দাবি করেন, ওয়াংচুকের চিকিৎসা বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। একই সঙ্গে যাঁরা সাধারণ পোশাকে এসে তাঁকে অনশনমঞ্চ থেকে সরিয়েছেন, তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করার দাবিও জানান তিনি।

অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য বলেন, “বিরোধীরা হঠাৎ ঘুম ভেঙে প্রশ্ন তুলছেন কেন ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হল। কিন্তু তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল এবং দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশও ছিল।”

মালব্যর দাবি, যাঁরা এতদিন এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছিলেন, ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর কথায়, “বিরোধীদের উদ্দেশ্য সমস্যার সমাধান নয়, রাজনৈতিক ফায়দা তোলা। সেই সুযোগই তারা হারিয়েছে।”