রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র আর বিনোদন দুনিয়ার ঝলমলে মঞ্চ—এই দুই জগতের প্রেম বা বিয়ে নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে এমন উদাহরণের অভাব নেই।
আমেরিকার সেনেটর জন ডব্লিউ ওয়ার্নার বিয়ে করেছিলেন অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেলরকে। সেনেটর কোরি বুকারের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন অভিনেত্রী রোজারিও ডসন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি বিয়ে করেছিলেন মডেল ও গায়িকা কার্লা ব্রুনিকে।
জাস্টিন ট্রুডোর নিজের পরিবারেও রয়েছে এমন গল্প। তাঁর বাবা, কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পিয়ের ট্রুডোর সঙ্গে একসময় বারব্রা স্ট্রেইস্যান্ড, কিম ক্যাট্রল এবং মার্গট কিডারের মতো তারকাদের নাম জড়িয়েছিল।
তবে এই ধরনের সম্পর্কে এত দিন সাধারণ ছবিটা ছিল অন্য রকম। বিনোদন জগতের তারকাই রাজনীতিকের দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছেন, আর ধীরে ধীরে বদলে নিয়েছেন নিজের পোশাক, প্রকাশভঙ্গি কিংবা জনসমক্ষে উপস্থিতির ধরন।
জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরির ক্ষেত্রে যেন গল্পটা উল্টো দিকে হাঁটছে।
পেরি নয়, বরং ট্রুডোই ঢুকে পড়ছেন পপ তারকার জগতে।
অবশ্য পেরিকেও মাঝে মাঝে ট্রুডোর রাজনৈতিক-অভিজাত পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাল মেলাতে দেখা গিয়েছে। দাভোসে তাঁকে দেখা গিয়েছিল একেবারে কর্পোরেট সাজে—উটের গায়ের রঙের স্কার্ট-স্যুট, সোনালি বোতামের মতো কানের দুল, চুল পরিপাটি করে পিছনে বাঁধা।
কিন্তু সেটাই যেন ব্যতিক্রম।
বেশির ভাগ সময় ছবিটা উল্টো। ট্রুডো নিজের চেহারা, পোশাক এবং জনসমক্ষে উপস্থিতির ধরন বদলে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দে ঢুকে পড়ছেন পপ তারকার প্রেমের দুনিয়ায়।
আর এই বদলকে নিছক ফ্যাশনের ব্যাপার হিসাবেই দেখছেন না বিশেষজ্ঞেরা।
নোভা স্কোশিয়ার অ্যাকাডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কানাডীয় রাজনীতির অধ্যাপক অ্যালেক্স মারল্যান্ড মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় নারীবাদ ছিল ট্রুডোর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর প্রথম মন্ত্রিসভায় নারী ও পুরুষের সংখ্যা সমান রাখা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়েছিল।
মারল্যান্ডের যুক্তি, বর্তমান সম্পর্কে ট্রুডো যদি নিজেকে কর্তৃত্বপরায়ণ, আধিপত্যশীল পুরুষ হিসেবে তুলে ধরতেন, তা হলে সেটি তাঁর এত দিনের ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হত।
তার বদলে তাঁর বর্তমান উপস্থিতি যেন অন্য একটি বার্তা দিচ্ছে—আধুনিক পুরুষত্ব মানে সব সময় সামনে থাকা নয়; কখনও কখনও সঙ্গীকে আলোয় জায়গা করে দেওয়াও।
একসময় তিনি ছিলেন জি-৭ দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন কোনও অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত প্রেমিকার পাশে দাঁড়িয়ে সহচরের ভূমিকায় থাকতে তাঁর আপত্তি নেই বলেই অন্তত জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি থেকে মনে হয়।
এমনকি সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটিয়ে, বিলাসবহুল ইয়টে সময় কাটিয়েও নিজের জীবন উপভোগ করতে তিনি বেশ স্বচ্ছন্দ।
কিন্তু এখানেই গল্পে ঢুকে পড়ছে রাজনীতি।
প্রেম যতটা ব্যক্তিগত, ছবি ততটা নয়
প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ট্রুডোর বিরুদ্ধে অন্যতম বড় সমালোচনা ছিল—নীতি নির্ধারণের দক্ষতার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আকর্ষণ এবং পারিবারিক পরিচয়ই তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যে বেশি ভূমিকা রেখেছে।
তিনি পিয়ের ট্রুডোর ছেলে—এই পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক উত্থানে বড় সুবিধা দিয়েছিল বলে সমালোচকেরা বারবার অভিযোগ করেছেন।
ক্ষমতা ছাড়ার পরে ট্রুডো যদি আরও বেশি করে তারকাখচিত বিনোদন জগতের অংশ হয়ে ওঠেন, তা হলে সেই পুরনো সমালোচনাই আবার ফিরে আসতে পারে।
বিশেষ করে যখন তাঁকে ভূমধ্যসাগরের বিলাসবহুল ইয়টে সময় কাটাতে দেখা যায়।
প্রশ্নটা তখন আর শুধু, ‘‘ট্রুডো কার সঙ্গে প্রেম করছেন?’’ থাকে না।
প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ‘‘একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নিজেকে কী ভাবে নতুন করে তুলে ধরছেন?’’
আর সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বর্তমান কানাডীয় রাজনৈতিক আবহে।
ভিনসেন্ট রেনল্ডের মতে, কানাডার বহু মানুষ এখন আমেরিকার প্রতি অত্যন্ত বিরক্ত। সেই সময়ে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী একজন মার্কিন পপ তারকার সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছেন এবং আমেরিকায় যথেষ্ট সময় কাটাচ্ছেন—এই ছবি অনেক কানাডীয়ের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক ফিফা বিশ্বকাপের সময় সেই অস্বস্তির জায়গাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কানাডার প্রথম ম্যাচে দেখা যায়নি ট্রুডোকে। অথচ আমেরিকার প্রথম ম্যাচে তিনি হাজির ছিলেন। কারণ, সেই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন কেটি পেরি।
অবশ্যই, এখন ট্রুডো সাধারণ নাগরিক। কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে থাকবেন, কোন ম্যাচ দেখবেন—সেটা তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
কিন্তু একবার কোনও দেশের মুখ হয়ে ওঠার পরে ‘ব্যক্তিগত নাগরিক’ পরিচয় কতটা ব্যক্তিগত থাকে?
সেখানেই আসল প্রশ্ন।
ক্ষমতা চলে যেতে পারে। পদ চলে যেতে পারে। কিন্তু একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রতীকী পরিচয় এত সহজে মুছে যায় না।
ফলে কেটি পেরির অনুষ্ঠান দেখতে আমেরিকার ম্যাচে যাওয়া, অথচ কানাডার ম্যাচে না থাকা—আইনগত বা আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও সমস্যা নয়। কিন্তু প্রতীকের রাজনীতিতে তার আলাদা অর্থ তৈরি হতেই পারে।
অটোয়া থেকে হলিউড
ট্রুডোর বদল শুধু তাঁর প্রেমের গল্পে নয়, তাঁর পোশাকেও স্পষ্ট।
একসময় তাঁর চেহারায় ছিল অটোয়ার ক্ষমতাবান রাজনীতিকের ছাপ। এখন সেই জায়গায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে মধ্যবয়সি, ফ্যাশনসচেতন, স্বচ্ছন্দ কোনও হলিউড তারকার ভাব।
এই বদল কারও পছন্দ হতে পারে, কারও বিরক্তিও লাগতে পারে।
কিন্তু এর মধ্যে আরও বড় একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে—রাজনীতি এবং বিনোদন জগতের সীমানা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
একসময় রাজনীতিকেরা তারকাদের জনপ্রিয়তা নিজেদের নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগাতেন। এখন রাজনীতিক নিজেই তারকা হয়ে উঠতে পারেন। আবার ক্ষমতা ছাড়ার পরে সেই রাজনৈতিক তারকাই সরাসরি ঢুকে পড়তে পারেন বিনোদন জগতের তারকা-সংস্কৃতির ভিতরে।
জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষেত্রে সেই রূপান্তরটি যেন চোখের সামনেই ঘটছে।
তিনি আর শুধু কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি এখন কেটি পেরির প্রেমিকও। আর সেই পরিচয় আড়াল করার বদলে পোশাক, জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং জীবনযাপনের ধরন দিয়ে যেন বেশ স্বচ্ছন্দেই গ্রহণ করছেন।
সাঁ-ত্রোপের সমুদ্রসৈকতে ট্রুডোর ছবিগুলি তাই নিছক কোনও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ছুটির ছবি নয়।
সেগুলি প্রেম, রাজনীতি, খ্যাতি এবং তারকা-সংস্কৃতির সীমারেখা মুছে যাওয়ার ছবিও।
আর পোশাক?
সম্ভবত সেটিই এই নতুন পরিচয়ের সবচেয়ে মজার দৃশ্যমান চিহ্ন।
ট্রুডোর নতুন ড্রেস কোডে রাজনীতি কম, পপ-স্টারডম একটু বেশি।