বাংলাস্ফিয়ার: ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে টাকা পাঠানো কিংবা কোনও ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর জন্য কোনও মাশুল দিতে হবে না। ইউপিআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে মাশুল চালু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে জল্পনার মধ্যেই শনিবার কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক স্পষ্ট করে দিল, সাধারণ নাগরিকের জন্য ইউপিআই আগের মতোই বিনামূল্যে থাকবে। তবে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি কিছু ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সামান্য ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা এমডিআর নেওয়ার পথ খোলা রাখা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠালে—যাকে ‘পার্সন-টু-পার্সন’ বা পি-টু-পি লেনদেন বলা হয়—কোনও মাশুল দিতে হবে না। একই ভাবে কোনও দোকান বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে অর্থ মেটানোর জন্যও ক্রেতার কাছ থেকে লেনদেনের মাশুল নেওয়া হবে না। অর্থাৎ চায়ের দোকানে ২০ টাকা দেওয়া থেকে শুরু করে বাজার, ট্যাক্সি বা অন্য কোনও পরিষেবার দাম ইউপিআইয়ে মেটালে গ্রাহকের উপর নতুন কোনও খরচ চাপছে না।

পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে মূলত ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে। কেন্দ্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমডিআর চালু করা হলে তা সব ব্যবসায়ীর সব লেনদেনের উপর চাপানো হবে না। নির্দিষ্ট সীমার বেশি অঙ্কের এবং সীমিত কিছু ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রেই এই মাশুল প্রযোজ্য হতে পারে। তার হারও ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে প্রচলিত এমডিআরের তুলনায় অনেক কম রাখা হবে। সরকারের দাবি, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবসায়িক ইউপিআই লেনদেন ভবিষ্যতেও বিনামূল্যেই থাকবে।

এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ‘ট্যাক্সেশন অ্যান্ড আদার লজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-কে ঘিরে। বিলটিতে পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেমস আইন, ২০০৭-এর ১০এ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব রয়েছে। সংসদে সংশোধনীটি পাশ হওয়ার পরে এমডিআর আদৌ চালু হবে কি না এবং হলে কোন ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেনে কত হারে তা বসবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া বা এনপিসিআইয়ের নেতৃত্বাধীন ‘ইউপিআই অ্যান্ড সার্ভিসেস স্টিয়ারিং কমিটি’। অর্থাৎ এখনই কোনও এমডিআর কার্যকর হচ্ছে না।

কেন্দ্রের ব্যাখ্যা, আইনের সংশোধনটি আসলে ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘সক্ষমতাদানকারী’ ব্যবস্থা। ইউপিআই লেনদেনের সংখ্যা যে গতিতে বাড়ছে, সেই পরিকাঠামো সচল ও নিরাপদ রাখতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাইবার নিরাপত্তা, জালিয়াতি প্রতিরোধ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সার্ভারের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আরও সংস্থাকে এই ব্যবস্থায় নিয়ে এসে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হলে ইউপিআই ব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি নিজস্ব আয়ভিত্তিও প্রয়োজন বলে সরকারের যুক্তি। কেবল সরকারি ভর্তুকির উপর নির্ভর করে ইউপিআইয়ের পরবর্তী পর্যায়ের সম্প্রসারণ চালানো দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মত নয় বলেও অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে।

এই ঘোষণার তাৎপর্য ইউপিআইয়ের বর্তমান ব্যাপ্তির পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২,৩৬৬ কোটি লেনদেন হয়েছে, যার মোট মূল্য ২৯.৯ লক্ষ কোটি টাকা। ভারত ছাড়াও বর্তমানে ১১টি দেশে ইউপিআই পরিষেবা চালু হয়েছে এবং আরও বেশ কয়েকটি দেশ এই ব্যবস্থায় আগ্রহ দেখিয়েছে।

২০১৬-১৭ সালে যাত্রা শুরুর পর ইউপিআই ভারতের দৈনন্দিন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান পরিকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সাধারণ ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য ইউপিআইয়ে শূন্য এমডিআর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এত দিন এই ব্যবস্থার খরচের একটি অংশ সরকারি সহায়তা ও উৎসাহভাতার মাধ্যমে বহন করা হয়েছে। কিন্তু লেনদেনের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকায় ব্যবস্থাটির আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে ব্যাঙ্ক ও অর্থপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

কেন্দ্র একই সঙ্গে কিছু সংবাদমাধ্যমের সেই দাবি খারিজ করেছে যে, বাইরের কোনও চাপের কারণে ইউপিআইয়ের নীতি বদলানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রকের বক্তব্য, ইউপিআই ভারতের নিজস্ব উদ্ভাবন এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য তাকে বিনামূল্যে রাখার নীতিতে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।

ফলে আপাতত সাধারণ ইউপিআই ব্যবহারকারীর জন্য ছবিটি পরিষ্কার—বন্ধুকে টাকা পাঠানো, পরিবারের সদস্যের অ্যাকাউন্টে অর্থ দেওয়া কিংবা দোকানে কিউআর কোড স্ক্যান করে দাম মেটানোর জন্য অতিরিক্ত মাশুল দিতে হবে না। সম্ভাব্য পরিবর্তনটি হবে ব্যবসায়িক ব্যবস্থার অন্য প্রান্তে। তাও সব ব্যবসায়ী বা সব লেনদেনে নয়; নির্দিষ্ট সীমার উপরে সীমিত কিছু লেনদেনে সামান্য এমডিআর বসতে পারে। সেই সীমা এবং মাশুলের হার এখনও নির্ধারিত হয়নি।