২৪ ঘণ্টায় ৬০ হাজারের ঢল, সেউতায় হাহাকার

যা জানা জরুরি
- মাদ্রিদ: মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সীমান্ত পেরিয়ে ঢল নেমেছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের।
- কেউ সমুদ্র সাঁতরে, কেউ সীমান্তের বেড়া টপকে ইউরোপীয় ভূখণ্ডে পৌঁছনোর মরিয়া চেষ্টা করেছেন।
- সেই ভয়াবহ যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪১ জন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মাদ্রিদ: মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সীমান্ত পেরিয়ে ঢল নেমেছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের। কেউ সমুদ্র সাঁতরে, কেউ সীমান্তের বেড়া টপকে ইউরোপীয় ভূখণ্ডে পৌঁছনোর মরিয়া চেষ্টা করেছেন। সেই ভয়াবহ যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪১ জন। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতা এখন নজিরবিহীন অভিবাসী সংকটের মুখে।
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছেন—যা শহরটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলির ক্ষমতা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। বহু নাবালক-সহ হাজার হাজার মানুষকে পার্ক, ফুটপাত ও খোলা জায়গায় রাত কাটাতে হয়।
তবে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাব কিছুটা আলাদা। তাদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পরে স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গিয়েছেন।
‘এটা ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’
শুক্রবার সেউতা সফরে গিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পরিস্থিতিকে স্পেনের “ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্র মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণঘাতী যাত্রায় নামতে উৎসাহিত করেছে।
সানচেজের দাবি, প্রতারণার শিকার হয়ে বহু তরুণ সমুদ্রপথে কিংবা সেউতার সীমান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছেন। তাঁদের অনেকেই সেই চেষ্টায় প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই বেড়ে অন্তত ৪১ হয়েছে। স্পেনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে এটি এখন শুধুমাত্র সীমান্ত-সংকট নয়, একটি বড় মানবিক বিপর্যয়।
সীমান্তে জলকামান, টিয়ার গ্যাস
সেউতা সীমান্তের পরিস্থিতিও ছিল চরম উত্তপ্ত। ভিডিও ফুটেজে দেখা গিয়েছে, জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং জলকামান ব্যবহার করছে।
তারপরও বহু মানুষ সীমান্তের বেড়া এড়িয়ে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছনোর চেষ্টা চালিয়ে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেনের পক্ষ থেকেও সেনাবাহিনীর গাড়ি মোতায়েন করা হয় এবং বাড়ানো হয় নিরাপত্তা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত খাবার ও আশ্রয়ের অভাবে বহু মানুষকে আবার মরক্কোয় ফিরে যেতে দেখা যায়।
রয়টার্সকে এক তরুণ মরক্কোর নাগরিক বলেন, তিনি নিজেও জানতেন না কেন এই যাত্রায় এসেছিলেন। আগের দিন দুপুরের পর থেকে কিছু খাননি বলেও জানান তিনি।
কেন সেউতাই লক্ষ্য?
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত এই দুই অঞ্চলেই।
এই কারণেই ইউরোপে পৌঁছতে মরিয়া অভিবাসীদের কাছে সেউতা গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। অনেকেই মরক্কোর ফনিদেক বা বেলিউনেচ উপকূল থেকে সাঁতরে সেউতায় পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। কেউ আবার সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর চেষ্টা করেন।
আদালতের রায় নিয়ে বিভ্রান্তি?
এই অভিবাসী ঢলের নেপথ্যে সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকেও দায়ী করছে স্পেনীয় প্রশাসন।
প্রশাসনের দাবি, আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে মানবপাচারকারীরা অভিবাসীদের বোঝায় যে সমুদ্রপথে সেউতা বা মেলিয়ায় পৌঁছতে পারলে তাঁদের আর তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। ফলে স্পেনে থেকে যাওয়ার সুযোগ মিলবে—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে।
সানচেজের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রই এই ভুল ব্যাখ্যাকে দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল।
তবে মরক্কোর কয়েকজন মানবাধিকারকর্মী এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের যুক্তি, অধিকাংশ অভিবাসীর ওই আদালতের রায় সম্পর্কে আদৌ জানার সম্ভাবনা কম। ফলে শুধুমাত্র আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যাকে এত বড় ঢলের প্রধান কারণ হিসেবে দেখাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এক দিনে হাজার হাজার মানুষের এই অভূতপূর্ব প্রবেশ শুধু স্পেনের সীমান্ত ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করেনি—ইউরোপের অভিবাসন নীতি, মানবপাচার এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



