বাংলাস্ফিয়ার: সিজেপি-নেতৃত্বাধীন ছাত্র আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুক সম্প্রতি মেদান্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। হাসপাতাল ছাড়ার পর প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, প্রথমে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজঘাটে যাবেন, তারপর ফিরে যাবেন নিজের বাড়ি লাদাখে। পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং একাধিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তিনি টানা ২৬ দিন অনশন করেছিলেন।

তবে আন্দোলনের অনেক আগেই, প্রায় তিন বছর আগে, ইউটিউব চ্যানেল ট্রাইবাল গার্ল-এর একটি ভিডিওতে তিনি দর্শকদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন তাঁর ব্যতিক্রমী বাড়ি। লাদাখের এই বাড়িতে একফোঁটা কংক্রিটও ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ মাটি দিয়ে তৈরি এই বাড়িতে শতাব্দীপ্রাচীন নির্মাণশৈলীকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সমসাময়িক নকশার সঙ্গে মিলিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক অনন্য পরিবেশবান্ধব আবাস।

ওয়াংচুক স্নেহভরে বাড়িটির নাম দিয়েছেন ‘ট্রাইবাল হাউস’। তাঁর কথায়, “আমরা ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী বাড়ি তৈরির পদ্ধতি ভুলে যাচ্ছি। এখন মাটির বাড়ি প্রায় দেখা যায় না। আমি অতীতের ভালো দিকগুলিকে ধরে রেখে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলিকে আরও উন্নত করেছি।”

বাড়ির অন্দরসজ্জায় রয়েছে আধুনিক আসবাবপত্র, কিন্তু তার সঙ্গে অটুট রয়েছে লাদাখের ঐতিহ্য। বসার ঘরে রয়েছে নিচু আসনের ব্যবস্থা। ওয়াংচুক বলেন, “লাদাখের মানুষ সাধারণত এভাবেই বসতে পছন্দ করেন। তাই আধুনিকতার মধ্যেও আমাদের সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছি।”

মাটির মোটা দেওয়াল গ্রীষ্মকালে ঘরের ভেতর স্বাভাবিকভাবেই শীতল পরিবেশ বজায় রাখে। আর শীতকালে উষ্ণতার জন্য জ্বালানি কাঠের উপর নির্ভর করতে হয় না। তার বদলে তিনি ব্যবহার করেছেন প্যাসিভ সোলার প্রযুক্তি। বাড়ির একটি বিশেষ দেওয়াল, যাকে তিনি ‘ব্ল্যাক ওয়াল’ বলেন, তার ভেতরে বসানো রয়েছে জলভর্তি বোতল। দিনের বেলায় শীতের রোদে সেই জল গরম হয় এবং সূর্য ডোবার পর ধীরে ধীরে সেই তাপ ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।

ওয়াংচুকের কথায়, “দেওয়াল, কাচ ও জানালাগুলি আধুনিক হলেও, এর মূল প্রযুক্তি এসেছে আমাদের ঐতিহ্য থেকেই।”

বাড়ির ছাদ কাঠের, দেওয়াল মাটির, আর ভিতরের সাজসজ্জা আধুনিক—সব মিলিয়ে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়।

রান্নাঘরেও ফুটে উঠেছে তাঁর জীবনদর্শন। এটি একটি উন্মুক্ত রান্নাঘর, যেখানে ডাইনিং টেবিলও রয়েছে। এর পেছনের ভাবনা খুবই সহজ—“যিনি রান্না করছেন, তিনি যেন কখনও নিজেকে পরিবারের বাইরে বা একা মনে না করেন।”

সবচেয়ে অভিনব অংশগুলির একটি হল শৌচাগার। এখানে প্রচলিত জলনির্ভর ব্যবস্থা নেই। ঐতিহ্যবাহী জলবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানববর্জ্য সংগ্রহ করা হয় এবং পরে তা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সারে পরিণত করা হয়।

ওয়াংচুক বহুবার বলেছেন, এই বাড়ি তৈরির উদ্দেশ্য শুধু নিজের থাকার জায়গা তৈরি করা নয়। তিনি চান, লাদাখের মানুষ ঐতিহ্যবাহী নির্মাণপদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব বাড়ি নির্মাণে উৎসাহিত হোন।

সম্প্রতি ২৬ দিনের অনশন শেষে বিজেপি সভাপতি জে. পি. নাড্ডার উপস্থিতিতে তিনি অনশন প্রত্যাহার করেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর ধর্মেন্দ্র প্রধান শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন এবং দেশের পরীক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্সও ঘোষণা করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক আন্দোলনের আগে সোনম ওয়াংচুক মূলত পরিচিত ছিলেন ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির ‘র‍্যাঞ্চো’ চরিত্রের বাস্তব অনুপ্রেরণা হিসেবে। যদিও ছবির নির্মাতারা বরাবরই দাবি করেছেন, চিত্রনাট্য লেখার সময় তাঁরা ওয়াংচুক সম্পর্কে জানতেন না। কিন্তু এই দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। কারণ, ছবির শুটিং শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে আমির খান একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

ওয়াংচুক নিজেও কখনও এই পরিচয় নিয়ে খুব উৎসাহী ছিলেন না। তাঁর দাবি, ছবি মুক্তির পর নিজের জীবনের সঙ্গে চরিত্রটির বিস্ময়কর মিলের কথা জানিয়ে তিনি নির্মাতাদের চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু সেই চিঠির কোনও উত্তর তিনি পাননি।