ওয়াশিংটন: হোয়াইট হাউসের চত্বরে ৪০ কোটি ডলারের বিশাল বলরুম তৈরির স্বপ্নে আপাতত আদালতের ‘ব্রেক’। শুক্রবার আমেরিকার একটি ফেডারেল আপিল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহু আলোচিত বলরুম প্রকল্প এখন আইনি জটিলতায় আটকে গেল।
তবে এই মামলার গুরুত্ব শুধু একটি বিলাসবহুল অনুষ্ঠানকক্ষ তৈরির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—হোয়াইট হাউসের মতো ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রেসিডেন্ট কতটা একতরফা পরিবর্তন আনতে পারেন?
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে যে জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানেই নতুন বলরুমটি নির্মাণের কথা। আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৪০ কোটি ডলার।
ট্রাম্পের যুক্তি, হোয়াইট হাউসে বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, নৈশভোজ কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের নিয়ে সমাবেশ করার মতো পর্যাপ্ত স্থায়ী জায়গা নেই। সেই ঘাটতি মেটাতেই অত্যাধুনিক এবং বড় আকারের বলরুম তৈরির পরিকল্পনা।
কিন্তু পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকেই আপত্তি উঠতে শুরু করে।
বিরোধীদের প্রশ্ন, হোয়াইট হাউসের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনায় এত বড় নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত পর্যালোচনার নিয়ম ঠিক ভাবে মানা হয়েছে কি না। তাঁদের বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রাখলেও সেই ক্ষমতার সীমা রয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা স্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে গেলে নির্দিষ্ট আইন ও পর্যালোচনা প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়।
সেই বিরোধই শেষ পর্যন্ত গড়ায় আদালতে।
নিম্ন আদালতের পর মামলা পৌঁছয় ফেডারেল আপিল আদালতে। শুক্রবার সেই আদালতই নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে মামলার পরবর্তী নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলরুম তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ল।
বলরুমের আড়ালে ক্ষমতার লড়াই
এই মামলার আসল গুরুত্ব এখানেই।
প্রশ্ন শুধু ইস্ট উইংয়ের জায়গায় নতুন একটি ভবন তৈরি করা যাবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা কোথায়?
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এবং সেটির কার্যকর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের যথেষ্ট স্বাধীনতা থাকা উচিত।
বিরোধী পক্ষের পাল্টা যুক্তি, সরকারি সম্পত্তি এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও কংগ্রেসের তৈরি আইন এবং নির্ধারিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
অর্থাৎ, আদালতে এখন শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্পের ভাগ্য নয়, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমানাও পরোক্ষ ভাবে পরীক্ষার মুখে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি নিয়ে এমনিতেই একের পর এক আইনি লড়াই চলছে। অভিবাসন নীতি থেকে সরকারি কর্মী ছাঁটাই, কেন্দ্রীয় অর্থব্যয় থেকে বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থার ক্ষমতা—বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
হোয়াইট হাউসের বলরুম মামলাটিও তাই সেই বৃহত্তর সংঘাতের আর একটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের পুরনো ‘বিগ ইজ বেটার’ ভাবনা
প্রকল্পটি ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগত ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে বড়, জাঁকজমকপূর্ণ এবং নজরকাড়া স্থাপত্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক বহু বার সামনে এসেছে। হোয়াইট হাউসেও তিনি এমন একটি স্থায়ী অনুষ্ঠানকক্ষ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যেখানে একসঙ্গে কয়েকশো অতিথিকে জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রকল্পের পক্ষে যুক্তি, বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিকাঠামো যথেষ্ট নয়। নতুন বলরুম হলে বিদেশি রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের নিয়ে বড় মাপের অনুষ্ঠান আয়োজন অনেক সহজ হবে।
কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, সেই সুবিধার জন্য হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক চরিত্রে এত বড় পরিবর্তন কতটা যুক্তিযুক্ত?
এখনই শেষ নয়
আপিল আদালতের নির্দেশে অবশ্য প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাচ্ছে না।
মামলার চূড়ান্ত রায় কী হয়, অথবা উচ্চতর আদালত পরবর্তী সময়ে কী নির্দেশ দেয়, তার উপরই নির্ভর করবে বলরুমের ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে আরও উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে।
তবে শুক্রবারের নির্দেশের তাৎক্ষণিক ফল একেবারে স্পষ্ট।
ইস্ট উইংয়ের জায়গায় ট্রাম্পের ৪০ কোটি ডলারের স্বপ্ন আপাতত থমকে গেল।
আর সেই স্বপ্নের সামনে এখন শুধু নির্মাণের প্রশ্ন নয়—দাঁড়িয়ে রয়েছে আদালত, আইন এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমারেখাও।