বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপির সামনে এখন এমন একটি সমস্যা, যার বিরুদ্ধে লড়াই করেই এক সময় তারা নিজেদের রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিল—তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এবং স্থানীয় স্তরে প্রভাব খাটিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ জমা পড়ার পরে অন্তত ৩২৫ জন কর্মী ও স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিজেপির অন্দরেই এই প্রবণতাকে কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘ তৃণমূল শাসনের সময় তৈরি হওয়া ‘তৃণমূলি সংস্কৃতি’র অনুপ্রবেশ।
বিজেপি নেতৃত্বের উদ্বেগের মূল কারণ শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়। ক্ষমতার হাতবদলের পরে বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ, পরিবহণ, বাজার, ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে ঠিকাদারি ও স্থানীয় বাণিজ্যের নানা ক্ষেত্রে দলের নাম ব্যবহার করে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পুরনো তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ স্থানীয় গোষ্ঠীর একাংশ বিজেপির ছাতার নীচে এসেছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের বিজেপি কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
দলের কাছে বিষয়টি বিশেষ অস্বস্তিকর। কারণ, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপির অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল তৃণমূল আমলে কথিত ‘সিন্ডিকেট রাজ’, ‘কাটমানি’ এবং ‘তোলাবাজি’র অভিযোগ। এখন বিজেপি সরকার ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের বিরুদ্ধেই একই ধরনের অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পথে হাঁটছে দল।
বিজেপির একাংশের মতে, সমস্যার একটি বড় কারণ পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির চরিত্র। দীর্ঘদিন ধরে বহু এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা, ঠিকাদারি, নির্মাণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সরকার বদলালেও সেই কাঠামো রাতারাতি বদলায়নি। বরং কোনও কোনও জায়গায় পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই রাজনৈতিক আনুগত্য বদলে নতুন ক্ষমতাসীন দলের কাছে চলে এসেছেন।
এখানেই বিজেপির ভিতরে ‘তৃণমূলি সংস্কৃতি’ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দলের পুরনো কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে সংগঠন বাড়ানোর জন্য অন্য দল থেকে বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীকে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অনেকে তৃণমূলের স্থানীয় ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলবদলের সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও কাজের ধরন বদলায়নি—এমন অভিযোগ উঠছে বিজেপির অন্দরেই।
তবে সমস্যাটিকে শুধু দলবদলুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতাও রয়েছে। কারণ, তোলাবাজির অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাঁদের সকলেই যে প্রাক্তন তৃণমূল কর্মী, এমন নয়। বিজেপির পুরনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এসেছে। ফলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, সমস্যাটি ব্যক্তির রাজনৈতিক অতীতের চেয়ে বেশি করে ক্ষমতা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত।
এই কারণেই ৩২৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তাৎপর্যপূর্ণ। অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী কাউকে সতর্ক করা হয়েছে, কাউকে সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে, আবার গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে কঠোরতর পদক্ষেপের পথও খোলা রাখা হয়েছে। দলের বার্তা স্পষ্ট—বিজেপির নাম ব্যবহার করে টাকা আদায় বা ব্যবসায়ীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় রক্ষাকবচ হবে না।
রাজনৈতিক দিক থেকেও বিজেপির সামনে ঝুঁকি যথেষ্ট। পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের পক্ষে জনমত তৈরির সময় দুর্নীতি ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ফলে নতুন সরকারের আমলে একই অভিযোগ চলতে থাকলে বিরোধীরা সহজেই বলতে পারবে, শুধু শাসক বদলেছে, ব্যবস্থা বদলায়নি।
অন্যদিকে বিজেপির নেতৃত্ব এই অভিযানকে নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের যুক্তি, আগের আমলে শাসক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও দলীয় স্তরে ব্যবস্থা নেওয়া হত না; বিজেপি সেখানে নিজেদের লোকের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করছে। অর্থাৎ অভিযোগের অস্তিত্ব নয়, অভিযোগের পরে দল ও প্রশাসন কী করছে—সেটিকেই পার্থক্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে তারা।
তবু সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠে। ৩২৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সংখ্যার বিচারে বড় পদক্ষেপ হলেও তোলাবাজির অভিযোগ বন্ধ না হলে তার রাজনৈতিক মূল্য সীমিত থাকবে। বিশেষ করে স্থানীয় থানা, পুরসভা-পঞ্চায়েত, বাজার কমিটি, নির্মাণ ব্যবসা ও ঠিকাদারি ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কতটা কমানো যায়, তার উপর নির্ভর করবে অভিযানের সাফল্য।
বিজেপির সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে দ্রুত বেড়ে ওঠা সংগঠনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে ক্ষমতার সঙ্গে তৈরি হওয়া নতুন স্বার্থগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা। যে ‘তোলাবাজি-সিন্ডিকেট সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে লড়াই করে দল পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সংস্কৃতি যদি নতুন রাজনৈতিক রং পরে ফিরে আসে, তা হলে বিজেপির জন্য সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপদ।