যুদ্ধ নয়, বোঝাপড়া

যা জানা জরুরি
- ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ এড়ানোর ডাক শি-র, সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব চিনা প্রেসিডেন্টের রবার্ট টেট, ওয়াশিংটন | দ্য গার্ডিয়ান | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কৃত্রিম…
- এমন আবহে দুই দেশ যাতে সামরিক সংঘাতের দিকে না এগোয়, তার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
- তাঁর বার্তা স্পষ্ট—দুই পরাশক্তিকে এড়াতে হবে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ এড়ানোর ডাক শি-র, সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব চিনা প্রেসিডেন্টের
রবার্ট টেট, ওয়াশিংটন | দ্য গার্ডিয়ান | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য ও তাইওয়ান—তিন ক্ষেত্রেই আমেরিকা ও চিনের টানাপড়েন তীব্র। এমন আবহে দুই দেশ যাতে সামরিক সংঘাতের দিকে না এগোয়, তার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাঁর বার্তা স্পষ্ট—দুই পরাশক্তিকে এড়াতে হবে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’।
হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতেই পারস্পরিক বোঝাপড়ার কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেন শি। তাঁর মতে, সেগুলি মেনে চললে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শক্তি ভবিষ্যতের সংঘাত এড়িয়ে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করার পথ খুঁজে পেতে পারে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্লোগানের প্রসঙ্গ টেনে শি বলেন, সংঘাতের বদলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত, যেখানে ‘চিনা জাতির মহান পুনরুত্থান’ এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলা’ পাশাপাশি এগোতে পারে।
ট্রাম্পের উপস্থিতিতে শি বলেন, “আমাদের যোগাযোগ আরও জোরদার করা উচিত। চিন ও আমেরিকার নিজস্ব পরিস্থিতি আলাদা। কিন্তু খোলামেলা, গভীর ও ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে আমাদের দু’দেশ পরস্পরকে আরও ভাল করে বুঝতে পারে, মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে রেখে মিলের জায়গাগুলি খুঁজে নিতে পারে এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের শান্তিতে সহাবস্থান করা উচিত। দুই বৃহৎ দেশ হিসেবে চিন ও আমেরিকা সহযোগিতা করলে উভয়েই লাভবান হবে, আর সংঘাতে জড়ালে দু’দেশেরই ক্ষতি হবে। আমাদের দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত আলোচনা বজায় রাখা এবং সঙ্কটের সময়ে যোগাযোগ ও সঙ্কট প্রতিরোধের ব্যবস্থা উন্নত করা উচিত।”
শি-র মতে, এই পথেই ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ এড়ানো সম্ভব। এই ধারণায় বলা হয়, কোনও উদীয়মান শক্তি যখন প্রতিষ্ঠিত শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন দুই পক্ষের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে। গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসের লেখা থেকে ধারণাটির সূত্রপাত।
গত মে মাসে বেজিংয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তুলেছিলেন শি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে তাঁর প্রশ্ন ছিল, এই ফাঁদ এড়ানোর জন্য তাঁর পরিকল্পনা কী।
উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ হিসেবে এক লক্ষ তরুণ আমেরিকানকে চিন সফরে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন শি। এমন সময়ে এই প্রস্তাব এল, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা তীব্র এবং পরস্পরের পণ্যের উপর শুল্কও চাপিয়েছে উভয় দেশ।
এর আগে শি ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান ট্রাম্প। তিনি উল্লেখ করেন, শি-ই প্রথম চিনা নেতা, যিনি দ্বিতীয় বার রাষ্ট্রীয় সফরে আমেরিকায় এলেন। এর আগে ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় সফরে আমেরিকায় এসেছিলেন শি।
ট্রাম্প বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি ও মাদাম পেং আমেরিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছেন—আমাদের প্রতিষ্ঠার ২৫০তম বার্ষিকীতে।”
শি-র সঙ্গে তাঁর “সত্যিকারের গভীর বন্ধুত্ব” গড়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, “আমাদের দুই দেশের সামনে থাকা বিষয়গুলি নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি এবং আমি বিরাট অগ্রগতি করেছি। বাণিজ্যিক সম্পর্কে আরও ভারসাম্য আনতে আমাদের প্রতিনিধিদলগুলি কাজ করছে। তার মধ্যে আমেরিকার কৃষক ও পশুপালকদের জন্য বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগও রয়েছে।”
ট্রাম্প জানান, বৈঠকে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তিনি ‘অতিবুদ্ধিমত্তা’ বলেও উল্লেখ করেন। মঙ্গলবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তৃতাতেও এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন তিনি।
শি-ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমার মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা রয়েছে। আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে এবং আমরা যোগাযোগ রেখেছি।”
সরাসরি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে শি বলেন, “এ বছর আপনার চিন সফরের সময়ে আমরা কৌশলগত স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক চিন–আমেরিকা সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছিলাম। চিন–আমেরিকা সম্পর্কের এই বিশাল জাহাজকে ভবিষ্যতের দিকে স্থির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।”
হোয়াইট হাউসের অভ্যর্থনার আগের সন্ধ্যাতেই কিছুটা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ করেছিলেন ট্রাম্প। চিনা নেতা ও তাঁর স্ত্রীকে স্বাগত জানাতে তিনি নিজে মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে যান। বিমান থেকে নামার পর সেখানেই তাঁদের অভ্যর্থনা জানান।
বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানেও ছিল আড়ম্বর। দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। ট্রাম্পের পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মেলানিয়া। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সহযোগীরাও। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ট্রাম্পের বিশেষ সহকারী ন্যাটালি হার্প, যাঁকে সহকর্মীরা ‘মানব প্রিন্টার’ বলে ডাকেন।
অভ্যর্থনা ও স্বাগত ভাষণের পর ট্রাম্প ও শি-র দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসার কথা ছিল।
তবে দুই নেতার কথায় যতই সৌহার্দ্যের সুর থাকুক, বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমঝোতা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে চিনের অগ্রগতি ধীর করতে মাইক্রোচিপ, অর্ধপরিবাহী, সফটওয়্যার এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি রফতানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে আমেরিকা।
অন্য দিকে, শুল্কের হার কম রাখার লক্ষ্যে গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি-র মধ্যে যে সাময়িক সমঝোতা হয়েছিল, তার মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সেই মেয়াদ এখন ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে বাণিজ্যের প্রশ্নে শি যে ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে ট্রাম্প এখনও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। ডিসেম্বরে মায়ামিতে নির্ধারিত জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে দু’জনের আবার দেখা হওয়ার কথা। তার আগে আরও সুবিধাজনক চুক্তি আদায়ের জন্য চাপ বজায় রাখতে চাইতে পারেন ট্রাম্প।
বাণিজ্যযুদ্ধ চললেও আমেরিকায় চিনা পণ্যের আমদানি বাড়ছে। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো চিনের ‘বাণিজ্য ঘাটতি’ এক লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছনোর পথে।
অনুবাদকের টীকা: মূল প্রতিবেদনের শেষ বাক্যে ‘বাণিজ্য ঘাটতি’ লেখা হয়েছে। প্রসঙ্গ অনুযায়ী এখানে ‘বাণিজ্য উদ্বৃত্ত’ বোঝানো হয়ে থাকতে পারে। মূলের শব্দবন্ধ অপরিবর্তিত রেখে অসংগতিটি চিহ্নিত করা হল।
মূল প্রতিবেদনের সংশোধনী: শি জিনপিংয়ের নামের বানান সংশোধন করতে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শিরোনাম ও প্রতিবেদনের পাঠ সংশোধন করা হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



