International

শি-তে মজেছেন ট্রাম্প!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • লাল গালিচা, কুর্নিশ আর ‘প্রাণের দোসর’—চিনা প্রেসিডেন্টের আতিথ্যে মুগ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেভিড স্মিথ, ওয়াশিংটন | দ্য গার্ডিয়ান একজন স্বৈরশাসক।
  • সংবাদমাধ্যম দমন করেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তাঁর প্রবল অ্যালার্জি।
  • বৃহস্পতিবার চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

লাল গালিচা, কুর্নিশ আর ‘প্রাণের দোসর’—চিনা প্রেসিডেন্টের আতিথ্যে মুগ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট

ডেভিড স্মিথ, ওয়াশিংটন | দ্য গার্ডিয়ান

একজন স্বৈরশাসক। সংবাদমাধ্যম দমন করেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তাঁর প্রবল অ্যালার্জি। অন্যজন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান।

বৃহস্পতিবার চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন এক দৃশ্য তৈরি হল, যা দুই শতাব্দীরও বেশি পুরনো এই ভবনের ইতিহাসে সম্ভবত বিরল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বললেন, “লক্ষণীয় ব্যাপার, হোয়াইট হাউসে এই প্রথম আমরা একসঙ্গে বৈঠক করছি। আর প্রেসিডেন্ট শি ইতিমধ্যেই দেখেছেন, তাঁর শেষ সফরের পর এখানে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে।”

শি-র মুখে অবশ্য কোনও ভাবান্তর নেই। তবে আমেরিকা ও চিনের পতাকায় সাজানো জমকালো প্রবেশকক্ষে একবার চোখ বোলালেই ট্রাম্পের কথার সত্যতা বোঝা যায়। এক দেওয়ালে যেখানে আগে বারাক ওবামার সরকারি প্রতিকৃতি ঝুলত, সেখানে এখন রক্তাক্ত ট্রাম্পের নাটকীয় ছবি—হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মুঠি উঁচিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর সেই বার্তা, “লড়াই করো!”

এদিকে চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের জন্য হোয়াইট হাউসের দরজা খোলা। অথচ বহু মার্কিন সাংবাদিকের প্রবেশ নিষেধ। সিএনএন, এমএস নাউ এবং পলিটিকোর উপর ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞাই তার উদাহরণ। প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক মাইকেল ম্যাকফল এই বৈপরীত্যকে বলেছেন “অন্যায় এবং লজ্জাজনক”।

তাঁর সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে চিনের স্থান ১৭৮—তার নীচে শুধু উত্তর কোরিয়া ও এরিত্রিয়া। আমেরিকাও অবশ্য নেমে এসেছে ৬৪ নম্বরে। যুক্তিটা যেন তৈরি: আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা চিনকে আমেরিকার মতো করে তুলতে চাইতেন। ট্রাম্পের সাধ, বোঝাই যাচ্ছে, আমেরিকাকে চিনের মতো করে তোলা।

সমীহের এমনই ঘটা যে কানে তালা লাগার জোগাড়। বুধবার রাতে স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে ট্রাম্প ছুটলেন মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে। বিমান থেকে নামার সময় শি-কে অভ্যর্থনা জানাতে নিজেই হাজির মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিদেশি নেতার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সচরাচর এতটা পথ পাড়ি দেন না। নিজের প্রবল প্রতাপশালী ‘প্রাণের দোসর’-এর জন্য আক্ষরিক অর্থেই লাল গালিচা বিছিয়ে দিলেন ট্রাম্প।

সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার এক্স-এ লিখলেন, “আপনি বিদেশি স্বৈরশাসক হলে ট্রাম্প শুধু আপনাকে আমেরিকায় আসার আমন্ত্রণই জানাবেন না, আপনার জন্য লাল গালিচাও পেতে দেবেন…”

ভ্লাদিমির, এবার হিংসে হচ্ছে তো?

প্রেমে গদগদ ট্রাম্প নিজের ট্রুথ সোশ্যাল মঞ্চে লিখলেন, “গতকাল বিমানের কাছে (বিমানবন্দরে!) প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে দেখা করেছি। তাঁকে শক্তিশালী, প্রাণবন্ত এবং সুস্থ দেখাচ্ছে—আগের চেয়েও ভাল। আর ম্যাডাম শি তো অবশ্যই সুন্দরী!”

কূটনৈতিক শিষ্টাচারে অবশ্য ভুল হয়েছে। শি-র স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে বোঝাতে ট্রাম্প লিখেছেন “ম্যাডাম শি”। বলা উচিত ছিল “ম্যাডাম পেং”—যে নামেই তিনি পরিচিত।

শি এমনই মহাতারকা যে তাঁকে দু’বার অভ্যর্থনা জানানো হল। বৃহস্পতিবার সকালে আরও পতাকা, আরও তুর্যধ্বনি, আরও একটি লাল গালিচা। হোয়াইট হাউসের দক্ষিণের বারান্দা থেকে বেরিয়ে শি ও পেং-কে স্বাগত জানালেন ট্রাম্প-দম্পতি।

এর পরে সেই জমকালো প্রবেশকক্ষে দুই নেতার বিবৃতি। সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার অনুমতি অবশ্য নেই। সামনে দুই দেশের প্রতিনিধিদল সুশৃঙ্খল সারিতে বসে। তাঁদের মধ্যে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও তাঁর স্ত্রী ঊষাও রয়েছেন।

প্রথমে বললেন ট্রাম্প। তিনি কখন সুবোধ বালক হয়ে থাকার চেষ্টা করছেন, তা বোঝা যায় সহজেই। সামনের পর্দায় ভেসে ওঠা লিখিত বক্তৃতাটি মোটামুটি মেনে চললেন। দোভাষী নিশ্চয়ই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। ট্রাম্পের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁকেও বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে পাক খেতে হয়নি।

শি-র সঙ্গে তাঁর “সত্যিকারের অসাধারণ বন্ধুত্ব”-এর ঢাক পেটালেন ট্রাম্প। দাবি করলেন, মে মাসে তাঁর চিন সফরের পর বাণিজ্যে দুই দেশের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। বললেন, “এই সফরে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং ‘অতিবুদ্ধিমত্তা’ সংক্রান্ত জরুরি বিষয়গুলি নিয়েও আমরা আলোচনা করব।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তিনি ওই বিকল্প নামেই ডাকলেন। শুনে শি-র চোখ উল্টে তাকাতে ইচ্ছে হয়ে থাকলেও, তিনি নিজেকে সামলে নিয়েছেন।

বিংশ শতাব্দীর স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে থাকা প্রেসিডেন্টের মতে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কী ভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে তার শিক্ষা নেওয়া যায়। জাপানি আক্রমণের মুখে চিনকে রক্ষা করতে সাহায্য করা ‘ফ্লাইং টাইগার্স’ বিমানবাহিনীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বললেন, “সাহসী মার্কিন বিমানচালকেরা স্বেচ্ছায় চিনে এসেছিলেন, ঐতিহ্যবাহী সেই দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে যোগ দিতে। তাঁরা ছিলেন সত্যিই অবিশ্বাস্য।”

আরও জানালেন, চিনা নাগরিকদের সঙ্গে মেলামেশা থেকেই মার্কিন মেরিন সেনারা “একটি চিনা শব্দবন্ধ গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আজও তাঁরা সেটি ব্যবহার করেন: গাং হো।”

ট্রাম্প কোনও অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন, অথচ অন্য সব বক্তার চেয়ে বেশি সময় মাইক্রোফোন দখল করে রাখেননি—এমন ঘটনা বিরল।

কিন্তু এ দিন বক্তব্যের সারবত্তায় এগিয়ে ছিলেন শি। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, বাড়ির কর্তা তিনিই। পিছনে দু’হাত জড়ো করে বসে থাকা ট্রাম্পকে লাগছিল ছোট শরিকের মতো।

শি বললেন, চিন-আমেরিকা সম্পর্কের “বিশাল জাহাজটিকে স্থির পথে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে” তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

টর্পেডোর তোয়াক্কা নেই, পুরো গতিতে এগিয়ে চলো!

মন জয়ের কৌশল শি-র ঝুলিতেও ছিল। তিনি বললেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমি পরস্পরকে সম্মান করি। আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। আমরা যোগাযোগও রেখেছি।”

বৃহস্পতিবার তিনি ঘোষণা করলেন, আগামী পাঁচ বছরে এক লক্ষ তরুণ মার্কিন পড়ুয়াকে চিনে পড়াশোনা করার আমন্ত্রণ জানানো হবে। তার চেয়েও সুখবর—আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানায় দু’টি জায়ান্ট পান্ডা পাঠাবে চিন, পিং পিং এবং ফুচুয়ান।

এর পরে এলেন আসল কথায়। জোর দিয়ে বললেন, দুই দেশ “শান্তিতে সহাবস্থান” করতে পারে। তাদের প্রতিযোগিতাও হওয়া উচিত “সুস্থ প্রতিযোগিতা”। শি ঘোষণা করলেন, “থুসিডিডিসের ফাঁদ এড়ানো সম্ভব।”

কথাটির মধ্যে অবশ্যই একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বার্তা রয়েছে: বিশ্বের প্রধান মহাশক্তির আসন থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে চিন।

তার পরে আরও একটু প্রশংসার প্রলেপ। বললেন, “চিনা জাতির মহান পুনরুত্থান এবং আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলা—দু’টি কাজ হাত ধরাধরি করে এগোতে পারে।”

এর পরের আয়োজন রোজ গার্ডেনে সামরিক অনুষ্ঠান। মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল সামরিক বিমান। ওভাল অফিসের ছাদে মার্কিন পতাকার পাশে উড়ল চিনের পতাকা। আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের আমলের সাজে বাদ্যযন্ত্রীদের দল কুচকাওয়াজ করল পাথর-বাঁধানো রোজ গার্ডেনে—শি-র আগের সফরের পর থেকে এ-ও আর এক পরিবর্তন। মাথায় তিনকোনা টুপি, সাদা পরচুলা, গায়ে লাল উর্দি।

পরিচিত কয়েকটি সংবাদচ্যানেলে এর কিছুই দেখা গেল না। নিষিদ্ধ সংবাদমাধ্যমগুলির পাশে দাঁড়িয়ে তারা যৌথ সম্প্রচার বয়কট করছিল।

জঙ্গলে একটা গাছ পড়ল, কিন্তু শোনার মতো কেউ নেই—তাহলে কি শব্দ হয়? একটা গণতন্ত্রের পতন হল, কিন্তু ছবি তোলার মতো কেউ নেই—তাহলে কি তার আর্তনাদ শোনা যায়?

এর পরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সাংবাদিককে বন্দি করে রাখা শাসকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসলেন ট্রাম্প। হয়তো কিছু কায়দাকানুন শিখে নেওয়াই উদ্দেশ্য।

দু’জনে যখন মুখোমুখি হলেন, সেটা কি রেগান-গর্বাচভের মতো ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ কোনও শীর্ষ বৈঠক ছিল? যেখানে আলোচনা হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম টানা এবং পৃথিবীটাকে ধ্বংস না করার অন্যান্য উপায় নিয়ে?

হয়তো নয়।

প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ান এবং দক্ষিণের লনে নিজের নতুন হেলিপ্যাড দেখাতে দেখাতে ট্রাম্প জানালেন, “আমাদের খুব ভাল বৈঠক হয়েছে। আর গ্রানাইটে ওঁর খুব আগ্রহ। উনি গ্রানাইট পছন্দ করেন। আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি পাথরের ব্যাপারেও উনি বিশেষজ্ঞ। ভাল গ্রানাইট উনি খুব ভালবাসেন।”

ট্রাম্পের উদ্ভট সব স্থাপত্যকীর্তি ঘুরে দেখার সেই বিভীষিকাময় সফর থেকে রেহাই পেলেন না এমনকি শি-ও।

বিকেলের মধ্যে নিষিদ্ধ সাংবাদিকদের কয়েকজনকে হোয়াইট হাউস চত্বরে ফিরতে দেওয়া হল। এক বিচারক ট্রাম্পের পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক বলেছেন। শি-কে ব্যাপারটা বোঝানো নিশ্চয়ই বেশ কঠিন হয়েছিল।

দমনপীড়নে ওস্তাদ এখনও শি-ই। ট্রাম্প তো স্রেফ ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’—শিক্ষানবিশ।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles