Home SportsFIFA 2026 আনচেলত্তির স্পর্শে বদলে যাওয়া ব্রাজিল, নরওয়ে ম্যাচে ইউরোপ-ভীতি কাটানোর বড় পরীক্ষা

আনচেলত্তির স্পর্শে বদলে যাওয়া ব্রাজিল, নরওয়ে ম্যাচে ইউরোপ-ভীতি কাটানোর বড় পরীক্ষা

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
13 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • বিশ্বকাপের আগে চরম অস্থিরতার মধ্যে ছিল ব্রাজিল ফুটবল।
  • কার্লো আনচেলত্তির আগমনের পর বদলে যায় দলের পরিবেশ ও মানসিকতা।
  • নেইমারের বদলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে নতুন ব্রাজিল।
  • জাপানের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে সেলেসাও।
  • নরওয়ের বিরুদ্ধে জিততে পারলে ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর স্বপ্ন আরও জোরালো হবে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার বলে খুব কম মানুষই মনে করেছিলেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে দলটি যেন একের পর এক সংকটের মধ্যে ডুবে ছিল। মাত্র চার বছরে চারজন কোচ বদল, ৯৫ জন ফুটবলারকে জাতীয় দলে ডাকা, ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতিকে অপসারণ ঘিরে প্রশাসনিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সেলেসাও শিবিরে স্থিতিশীলতা বলতে কিছুই ছিল না। মাঠের ব্যর্থতার সঙ্গে সংগঠনগত বিশৃঙ্খলাও যোগ হওয়ায় সমর্থকদের মধ্যেও জন্ম নিয়েছিল গভীর হতাশা।

এই অন্ধকার সময়েই দায়িত্ব নেন কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বের অন্যতম সফল কোচের আগমনের পর থেকেই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে ব্রাজিলের চেহারা। শুধু খেলার ধরন নয়, বদলে যায় দলের মানসিক অবস্থাও। সমর্থকেরা আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ব্রাজিল ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ জিততে পারে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সালের দীর্ঘ বিরতির পর এটিই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শিরোপা-খরা।

দলের সিনিয়র ফুটবলারদের মতে, আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর উপস্থিতি। গোলরক্ষক অ্যালিসন, অধিনায়ক মারকিনিয়োস, দানিলো কিংবা কাসেমিরোর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররাও মনে করেন, বেঞ্চে এমন একজন কিংবদন্তি কোচ থাকলে চাপ অনেকটাই কমে যায়। পাঁচবারের ইউরোপসেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার জয়ী কোচের অভিজ্ঞতা খেলোয়াড়দের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে।

অ্যালিসন বলেছেন, গত কয়েক বছর ফুটবলারদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা দলকে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু আনচেলত্তি আসার পর সেই পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন সবাই শুধুই অনুশীলন, পরিকল্পনা এবং খেলায় মন দিতে পারছেন। বিতর্ক নয়, কাজই এখন দলের প্রধান পরিচয়।

মারকিনিয়োসের কথায়, আনচেলত্তি খুব দ্রুত বুঝে ফেলেন কোন ফুটবলারের কাছ থেকে কীভাবে সেরা পারফরম্যান্স বের করে আনতে হবে। তিনি শুধু কৌশলগত পরিবর্তন করেননি, দলের মানসিকতাও পাল্টে দিয়েছেন। খেলোয়াড়দের স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই তিনি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন।

জাপানের বিরুদ্ধে শেষ বত্রিশের ম্যাচটি ছিল সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রথমার্ধে কেইশু সানোর গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আগের ব্রাজিল হয়তো ভেঙে পড়ত। পরিসংখ্যানও সেটাই বলছিল। ২০২৩ সালের পর থেকে ১২ বার প্রথমে গোল খেয়ে ব্রাজিল সাতটি ম্যাচ হেরেছে এবং চারটি ড্র করেছে। অর্থাৎ, পিছিয়ে পড়া মানেই প্রায় নিশ্চিত বিপর্যয়।

কিন্তু এবার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিরতির সময় ড্রেসিংরুমে আনচেলত্তির শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তা খেলোয়াড়দের নতুন শক্তি দেয়। তিনি সবাইকে বলেন, ব্রাজিল অবশ্যই সমতা ফিরিয়ে আনবে এবং শেষ পর্যন্ত জিতবে। সেই বিশ্বাসই মাঠে বাস্তব হয়ে ওঠে।

জয়সূচক গোলদাতা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি পরে বলেন, আনচেলত্তির শান্ত স্বভাবই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর শরীরী ভাষা থেকেই আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। তিনি কখনও আতঙ্কিত হন না, বরং খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করিয়ে দেন যে ম্যাচ এখনও তাদের হাতেই রয়েছে। সেই বিশ্বাসই জাপানের বিরুদ্ধে প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

আনচেলত্তির আরেকটি সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল নেইমারকে প্রথম একাদশের বাইরে রাখা। ৩৪ বছর বয়সী নেইমার আর আগের মতো ফিট নন। অনেক কম অভিজ্ঞ কোচ হয়তো তাঁর খ্যাতির কারণে শুরু থেকেই খেলাতেন। কিন্তু আনচেলত্তি আবেগের বদলে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। পুরো বিশ্বকাপে নেইমার খেলেছেন মাত্র ১৪ মিনিট। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই সংক্ষিপ্ত উপস্থিতির পর জাপানের ম্যাচেও তাঁকে নামানো হয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নেইমার নিজেও এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, ব্রাজিল দলের কেন্দ্রবিন্দু এখন আর তিনি নন। সেই জায়গা এখন দখল করেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বেই ভবিষ্যতের ব্রাজিলকে গড়ে তুলতে চাইছেন আনচেলত্তি।

তবে শুধু কৌশল নয়, মানসিক প্রস্তুতিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন ইতালীয় কোচ। তাঁর কোচিং দলে রয়েছেন ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী মারিসা সান্তিয়াগো, যিনি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোচিং স্টাফের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। আনচেলত্তি প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেন এবং খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর নানা উপায় নিয়ে কাজ করেন। ফুটবলারদের সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত আলোচনাও করছেন তিনি, যাতে বড় ম্যাচের চাপ সামলানো সহজ হয়।

এই প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন নরওয়ের বিরুদ্ধে। কারণ ব্রাজিলের সামনে শুধু একটি কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নয়, রয়েছে বহু বছরের এক মানসিক অভিশাপও। ২০০২ সালের ফাইনালে জার্মানিকে হারানোর পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনও ইউরোপীয় দলকে হারাতে পারেনি ব্রাজিল। ২০০৬ সালে ফ্রান্স, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ সালে জার্মানি, ২০১৮ সালে বেলজিয়াম এবং ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে বিদায় নিতে হয়েছে।

এবার সেই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ। একদিকে থামাতে হবে আর্লিং হালান্ডের মতো বিধ্বংসী স্ট্রাইকারকে, অন্যদিকে কাটিয়ে উঠতে হবে অতীতের ব্যর্থতার মানসিক চাপ। আনচেলত্তির সামনে তাই কৌশলগত লড়াইয়ের পাশাপাশি আরও বড় কাজ—খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করানো যে ইতিহাস সবসময় পুনরাবৃত্তি হয় না।

নরওয়েকে হারাতে পারলে হয়তো ব্রাজিল এখনও বিশ্বকাপের এক নম্বর দাবিদার হয়ে উঠবে না। কিন্তু গোটা ফুটবল বিশ্ব আবার নতুন করে সেলেসাওকে দেখতে শুরু করবে। তখন ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে ফেরানোর স্বপ্ন আর কেবল আবেগের গল্প থাকবে না; সেটি বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হবে। আনচেলত্তির নেতৃত্বে নতুন ব্রাজিল সেই বিশ্বাসই ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles