Table of Contents
হাইলাইটস
- সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে অভিন্ন নাগরিক বিধি (ইউসিসি) বিল।
- উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর পশ্চিমবঙ্গেও সব ধর্মের জন্য এক দেওয়ানি আইন কার্যকরের উদ্যোগ।
- বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ ও সম্পত্তি বণ্টনে থাকবে অভিন্ন বিধান।
- একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ, বিবাহের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর।
- ছেলে-মেয়ের সমান উত্তরাধিকার, সব ধর্মের মানুষের জন্য দত্তক গ্রহণের সমান অধিকার এবং অভিন্ন ভরণপোষণ ব্যবস্থার প্রস্তাব।
- ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে সকল নাগরিকের জন্য এক দেওয়ানি আইন প্রয়োগই বিলের মূল লক্ষ্য।
বাংলাস্ফিয়ার: সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ অভিন্ন নাগরিক বিধি বিল, ২০২৬। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পর এই বিল পাশ হলে পশ্চিমবঙ্গ হবে দেশের তৃতীয় রাজ্য, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ অভিন্ন দেওয়ানি আইন কার্যকর হবে। বিলের মূল লক্ষ্য, ধর্মভেদে পৃথক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে সমস্ত নাগরিকের জন্য একই আইন প্রয়োগ করা। যদিও এই আইন ফৌজদারি নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে পারিবারিক ও দেওয়ানি অধিকার এবং দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।
বিবাহ
অভিন্ন নাগরিক বিধি কার্যকর হলে সব ধর্মের মানুষের জন্য একই বিবাহ আইন প্রযোজ্য হবে। পুরুষের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর নির্ধারিত থাকবে। একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ হবে এবং উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বেচ্ছাসম্মতি ছাড়া কোনও বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হবে না। প্রতিটি বিবাহ বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি নথিভুক্ত করতে হবে। আইন দ্বারা নিষিদ্ধ নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহও গ্রহণযোগ্য হবে না।
বিবাহবিচ্ছেদ
বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও সব ধর্মের জন্য একই নিয়ম কার্যকর হবে। নিষ্ঠুরতা, পরিত্যাগ, ব্যভিচার, মানসিক অসুস্থতা বা দীর্ঘদিন আলাদা বসবাসের মতো কারণের ভিত্তিতে আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করা যাবে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের সুযোগও থাকবে। ধর্মীয় প্রথার মাধ্যমে একতরফা বিবাহবিচ্ছেদ আর আইনি স্বীকৃতি পাবে না।
উত্তরাধিকার
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকার ধর্মের ভিত্তিতে নয়, আত্মীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। ছেলে ও মেয়ে সমান অধিকার পাবে। বিধবা স্ত্রী বা বিধুর সমান অধিকার থাকবে। প্রয়োজনে মা-বাবাও আইনে নির্ধারিত অংশের উত্তরাধিকারী হবেন। অর্থাৎ উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ধর্মভেদে আলাদা নিয়ম থাকবে না।
দত্তক গ্রহণ
সব ধর্মের মানুষ আইনত সন্তান দত্তক নিতে পারবেন। দত্তক নেওয়া সন্তান জৈব সন্তানের মতোই সমান আইনি মর্যাদা, পরিচয় এবং উত্তরাধিকার অধিকার ভোগ করবে। দত্তক গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক থাকবে।
ভরণপোষণ
স্বামী, স্ত্রী, সন্তান এবং প্রয়োজন হলে নির্ভরশীল বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে। বিবাহবিচ্ছেদের পরে আর্থিকভাবে দুর্বল পক্ষ আদালতের মাধ্যমে ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন। সন্তানের লালনপালনের দায়িত্ব উভয় অভিভাবকের উপর সমানভাবে বর্তাবে।
সম্পত্তির উত্তরাধিকার
সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও ধর্মভেদে কোনও আলাদা বিধান থাকবে না। ছেলে ও মেয়ে সমান অংশীদার হবে। বিধবা স্ত্রী বা স্বামী সমান অধিকার পাবেন। কেউ উইল করে গেলে সেই উইল অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন হবে। উইল না থাকলে অভিন্ন নাগরিক বিধির নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হবে।
সহবাস সম্পর্ক
উত্তরাখণ্ডের অভিন্ন নাগরিক বিধিতে সহবাস বা লিভ-ইন সম্পর্কের নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। ওই সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের বৈধতা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সঙ্গীর ভরণপোষণের অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত বিলে এই বিধান একইভাবে রাখা হবে কি না, তা বিলটি বিধানসভায় পেশ হওয়ার পর স্পষ্ট হবে।
বিলের মূল উদ্দেশ্য
অভিন্ন নাগরিক বিধির মূল দর্শন হল ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক ব্যক্তিগত আইন তুলে দিয়ে সকল নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন কার্যকর করা। এর মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা, একবিবাহ নিশ্চিত করা, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনে বৈষম্য দূর করা, দত্তক গ্রহণ ও ভরণপোষণে সমান আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং পারিবারিক আইনকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা এই বিলের প্রধান উদ্দেশ্য।