হাইলাইটস:
- আট অভিযুক্তের সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক হিসাব ও পরিবারের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে পুলিশ
- এক অভিযুক্তের নামে অযোধ্যায় ২৩ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের জমি কেনার তথ্য তদন্তে নতুন মোড় এনেছে
- গত পাঁচ বছরের আয়, ব্যয় ও বিনিয়োগের হিসাব মিলিয়ে ‘অসঙ্গত সম্পদ’-এর সন্ধান করছে তদন্তকারী দল
- অভিযোগ, অনুদানের অর্থ দিয়ে জমি, স্মার্টফোন, গৃহস্থালির নানা বৈদ্যুতিন সামগ্রী কেনা হয়েছে
- ইতিমধ্যেই আট অভিযুক্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে, দুর্নীতি দমন আদালতে শক্তিশালী চার্জশিটের প্রস্তুতি
বাংলাস্ফিয়ার: অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের অনুদান তছরুপের অভিযোগে তদন্ত আরও জোরদার করল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। এবার জেলে থাকা আট অভিযুক্তের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজে নেমেছেন তদন্তকারীরা। অভিযুক্তদের নিজেদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক লেনদেন এবং সাম্প্রতিক আর্থিক বৃদ্ধির উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য, অনুদানের অর্থ কোথায় গিয়েছে এবং সেই অর্থ দিয়ে কী কী সম্পদ তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ চিত্র আদালতের সামনে তুলে ধরা।
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে অভিযুক্ত লবকুশ মিশ্রের একটি জমি কেনার ঘটনায়। পুলিশ জানতে পেরেছে, সম্প্রতি অযোধ্যার শাহাদতগঞ্জ এলাকায় ২৩ লক্ষ টাকারও বেশি মূল্যের একটি জমি কেনা হয়েছে। অভিযুক্তের শ্বশুরের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করতে গিয়েই এই সম্পত্তির নথির সন্ধান পান তদন্তকারীরা। এরপর থেকেই শুধু নগদ অর্থ নয়, সম্পত্তি কেনাবেচা ও বিনিয়োগের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আট অভিযুক্তের প্রত্যেকের আয়কর সংক্রান্ত নথি, আধার ও প্যানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাঁরা রামমন্দিরে কাজ পাওয়ার আগে কত আয় করতেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর বছরে কত আয় হয়েছে এবং সেই আয়ের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। তদন্তের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিও ঠিক করা হয়েছে। মোট বৈধ আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ স্বাভাবিক জীবনযাপনের ব্যয় হিসেবে ধরা হবে এবং বাকি ৩০ শতাংশ সম্ভাব্য সঞ্চয় বা বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর বাইরে যে সম্পদের হদিস মিলবে, তার উৎস জানতে কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অনুদানের অর্থের একটি অংশ শুধু জমি কেনাতেই নয়, বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য কেনার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে বলে সন্দেহ। স্মার্টফোন, ওয়াশিং মেশিন, গৃহস্থালির নানা বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম এবং অন্যান্য দামী সামগ্রী কেনার তথ্য মিলেছে। এসব কেনাকাটার সঙ্গে অভিযুক্তদের ঘোষিত আয়ের কোনও সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের সন্দেহ, অভিযুক্তরা নিজেদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নাম ব্যবহার করে অনুদানের অর্থ গোপন করার চেষ্টা করেছেন। সেই কারণে শুধু অভিযুক্তদের নয়, তাঁদের আত্মীয়স্বজনের ব্যাঙ্ক হিসাব, সম্পত্তি এবং আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। প্রয়োজন হলে বেনামি সম্পত্তির দিকেও নজর দেওয়া হবে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি।
এর আগে উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল প্রাথমিক অনুসন্ধানে অনুদান ব্যবস্থাপনায় একাধিক গুরুতর অনিয়ম, নিরাপত্তা ঘাটতি এবং নির্ধারিত বিধি লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই এফআইআর দায়ের করা হয়। অভিযোগ ওঠে, মন্দিরে আসা নগদ অনুদান ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তদন্তে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭৯.৮৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া আটজনের মধ্যে রয়েছেন রামাশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু, অনুকল্প মিশ্র, অবিনাশ শুক্ল, করুণেশ পাণ্ডে, মনীশ যাদব, লবকুশ মিশ্র, রামাশঙ্কর মিশ্র এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী সুভাষ শ্রীবাস্তব। অভিযোগ, অনুদানের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনা এবং সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন এঁদের অনেকেই। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, চুরি এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক ধারায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে গত কয়েক দিনে অভিযুক্তদের বাড়িতেও একাধিক দফায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। জমির দলিল, ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত নথি, আর্থিক কাগজপত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। পাশাপাশি, গত পাঁচ বছরের ব্যাঙ্ক হিসাবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাতটি ব্যাঙ্ক থেকে হিসাবের বিবরণ চাওয়া হয়েছে, যাতে অর্থের উৎস ও প্রবাহ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়।
এই ঘটনা রাজনৈতিক বিতর্কও উসকে দিয়েছে। বিরোধী দলগুলি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে এবং মন্দির ট্রাস্টের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। যদিও ট্রাস্টের অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা দায়ের হয়েছে এবং তদন্ত এগোচ্ছে বলে প্রশাসনের দাবি। তদন্তকারীদের বক্তব্য, কারও বিরুদ্ধে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছনো নয়, বরং আর্থিক নথি, সম্পত্তির উৎস এবং ব্যাঙ্ক লেনদেনের ভিত্তিতেই মামলাকে আদালতে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
অযোধ্যা পুলিশ এখন মূলত অর্থের সম্পূর্ণ গতিপথ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। অনুদানের অর্থ কোথা থেকে কোথায় গিয়েছে, কার কার নামে সম্পদ তৈরি হয়েছে এবং এই তছরুপে আরও কেউ জড়িত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল। সম্পত্তির নথি, ব্যাঙ্ক হিসাব ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ মিলিয়ে তদন্তের পরবর্তী ধাপেই স্পষ্ট হতে পারে এই বহুচর্চিত অনুদান কাণ্ডের প্রকৃত ব্যাপ্তি।