খবর

চোরাশিকারিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ, কাঠগড়ায় দিল্লির নামী বন্যপ্রাণী সংস্থা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: চিতাবাঘের চামড়া উদ্ধারের কৃতিত্ব নিতে গোটা অভিযানটি সাজানো হয়েছিল—মধ্যপ্রদেশের বনকর্তাদের এমনই বিস্ফোরক অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে দিল্লির পরিচিত বন্যপ্রাণী সংস্থা ‘ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস’।
  • সংস্থার দুই কর্মীকে চোরাশিকারের অভিযোগে গ্রেফতার করার পর তাঁদের বয়ানের ভিত্তিতে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক কার্তিক সত্যনারায়ণকে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
  • তদন্তকারীদের দাবি, কার্তিকের সঙ্গে সন্দেহজনক অভিযানের যোগসূত্র নির্দেশ করে এমন যথেষ্ট বৈদ্যুতিন তথ্যপ্রমাণ তাঁদের হাতে এসেছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: চিতাবাঘের চামড়া উদ্ধারের কৃতিত্ব নিতে গোটা অভিযানটি সাজানো হয়েছিল—মধ্যপ্রদেশের বনকর্তাদের এমনই বিস্ফোরক অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে দিল্লির পরিচিত বন্যপ্রাণী সংস্থা ‘ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস’। সংস্থার দুই কর্মীকে চোরাশিকারের অভিযোগে গ্রেফতার করার পর তাঁদের বয়ানের ভিত্তিতে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক কার্তিক সত্যনারায়ণকে নোটিস দেওয়া হয়েছে।

তদন্তকারীদের দাবি, কার্তিকের সঙ্গে সন্দেহজনক অভিযানের যোগসূত্র নির্দেশ করে এমন যথেষ্ট বৈদ্যুতিন তথ্যপ্রমাণ তাঁদের হাতে এসেছে। ব্যক্তিগত লাভ এবং নিজেদের চোরাশিকার-বিরোধী ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তিনি চোরাশিকারের ব্যবস্থা করে পরে সাজানো অভিযানে চামড়া উদ্ধার করাতেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বন্যপ্রাণীর দেহাংশ পাচারেও তাঁর ভূমিকা ছিল কি না, তদন্তের আওতায় রয়েছে সেই প্রশ্নও। তবে অভিযোগগুলি এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

মধ্যপ্রদেশের মুখ্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষক সমীতা রাজৌরা জানিয়েছেন, ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস-এর বেতনভুক দুই অভিযুক্ত কার্তিক সত্যনারায়ণের নাম করায় তাঁকে তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজির হতে বলা হয়েছে। রাজ্য বন দফতর এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোর সঙ্গেও সমন্বয় রেখে চলছে। কার্তিক এবং সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা তথা সচিব গীতা শেষমণির প্রতিক্রিয়া অবশ্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার সূত্রপাত ২৩ জুলাই। গোয়ালিয়র-আগ্রা সড়কে দশটি চিতাবাঘের চামড়াসহ চার সন্দেহভাজন চোরাশিকারিকে গ্রেফতার করা হয়। সে সময়ে ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস দাবি করেছিল, তাদের ‘ফরেস্ট ওয়াচ’ চোরাশিকার-বিরোধী শাখার কয়েক মাসের নজরদারির ফলেই ওই সাফল্য এসেছে। কিন্তু চামড়াগুলি মধ্যপ্রদেশ থেকে এসেছিল বলে রাজ্যের বাঘ সংরক্ষণ বিশেষ বাহিনী সমান্তরাল তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তেই উদ্ধার অভিযানের সরকারি বয়ানটি উল্টে যেতে শুরু করে।

শিবপুরী ও মোরেনার জঙ্গলে তল্লাশি চালিয়ে এমন একাধিক জায়গার সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে চিতাবাঘের দেহাবশেষ পুঁতে রাখা হয়েছিল। সেগুলি দেহরাদুনের ভারতীয় বন্যপ্রাণী প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। ২৩ জুলাই উদ্ধার হওয়া চামড়ার সঙ্গে দেহাবশেষের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে। তদন্তকারীরা তিনটি লোহার পা-ধরা ফাঁদও উদ্ধার করেন। সেই সূত্র ধরেই প্রথমে ভগবান সিংহ এবং পরে ওয়াসিমের সন্ধান পাওয়া যায়। ১১ আগস্ট ভগবানকে এবং ১৩ আগস্ট ওয়াসিমকে গ্রেফতার করে মধ্যপ্রদেশের বিশেষ বাহিনী।

বন দফতরের দাবি, দীর্ঘদিন বন্যপ্রাণীর দেহাংশের ব্যবসায় যুক্ত ভগবান অন্তত পাঁচ বছর ধরে ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস-এর বেতনভুক ছিলেন। ওয়াসিমও ওই সংস্থার কর্মী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, তাঁরা ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস-এর একটি গাড়িতে শিবপুরী ও মোরেনার বনাঞ্চল ঘুরে সম্ভাব্য শিকারের জায়গা চিহ্নিত করতেন। হরিয়ানা থেকে আনা পা-ধরা ফাঁদ বাছাই করা স্থানীয় শিকারিদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হত। ওই গাড়িটি এখন বিশেষ বাহিনীর হেফাজতে।

তদন্তকারীদের সন্দেহ, ভগবানই চারজন চোরাশিকারিকে দশটি চামড়া নিয়ে গোয়ালিয়র-আগ্রা সড়কের একটি ধাবার কাছে সাজানো ক্রেতার সঙ্গে দেখা করতে পাঠিয়েছিলেন। সেখানেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে। অর্থাৎ, যে ঘটনাকে চোরাশিকার-বিরোধী অভিযানের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিই পূর্বপরিকল্পিত ‘উদ্ধার’ ছিল কি না, এখন তার তদন্ত চলছে।

বন দফতরের এক আধিকারিকের প্রশ্ন, এটি সত্যিই চোরাশিকারিদের ধরার গোপন অভিযান হলে দশটি চিতাবাঘ মারা যাওয়া পর্যন্ত তা চলতে দেওয়া হল কেন? অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছর থেকেই শিবপুরী অঞ্চলে এই চক্র সক্রিয় ছিল। আরও উদ্বেগের বিষয়, যে এলাকায় চিতা রয়েছে, সেখানে লোহার ফাঁদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই ফাঁদে বাঘও মারা পড়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না, যদিও শিবপুরী অঞ্চলে বাঘের উপস্থিতি নিয়মিত নয়।

অবসরপ্রাপ্ত এক বনকর্তার মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এর সঙ্গে বন্যপ্রাণী পাচারের একটি পুরনো কৌশলের মিল পাওয়া যাবে। সেই কৌশলে পাচারকারীরা মূল্যবান অংশ গোপনে বিক্রি করে লাভ করে, আর তুলনায় কম মূল্যবান কিছু সামগ্রীসহ প্রতিদ্বন্দ্বী বা ছোট শিকারিদের ধরিয়ে দিয়ে প্রশাসনের প্রশংসা কুড়োয়। কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ক্ষেত্রে এই ‘সাফল্য’ বিদেশি অনুদান ও দাতা আকর্ষণের হাতিয়ারও হতে পারে।

ভগবানের গ্রেফতার ২০২৩ সালের একটি ঘটনাকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তামিলনাড়ুর সত্যমঙ্গলম অরণ্যে বাঘের চামড়া, চিতাবাঘের চামড়া এবং একটি বাঘের কঙ্কাল উদ্ধারের সময় ভগবান ও ওয়াসিম উপস্থিত ছিলেন বলে বন দফতর সূত্রের দাবি। সেই অভিযান এবং পরবর্তী সাজায় চোরাশিকার-বিরোধী ভূমিকার কৃতিত্বও নিয়েছিল ওয়াইল্ডলাইফ এসওএস।

কার্তিক সত্যনারায়ণ ও গীতা শেষমণি ১৯৯৫ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। আগ্রার ভালুক উদ্ধারকেন্দ্র দিয়ে শুরু করে পরে মথুরায় হাতি পরিচর্যাকেন্দ্র গড়ে সংস্থাটি। বিভিন্ন রাজ্য সরকারের সঙ্গে সমঝোতাপত্রের ভিত্তিতে দেশজুড়ে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। সেই সুবিশাল উদ্ধার-পরিচয়ের আড়ালে সত্যিই কি শিকার, পাচার ও সাজানো অভিযানের কোনও অন্ধকার ব্যবস্থা চলছিল—এখন তারই উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles