হাইলাইটস:

  • চলতি বাজেট অধিবেশনেই শেষ চার বছরের CAG রিপোর্ট টেবিলে রাখার সম্ভাবনা।
  • ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের রিপোর্ট এখনও বিধানসভায় পেশ হয়নি।
  • রিপোর্টে আর্থিক অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে ত্রুটি ও ব্যয়ের প্রশ্ন উঠে আসতে পারে।
  • তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র করার সুযোগ পাবে বিজেপি।
  • বিরোধী শিবিরে ভাঙন ও বিদ্রোহের আবহে এই পদক্ষেপের তাৎপর্য বাড়ছে।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার চলতি বাজেট অধিবেশন শুধু নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, রাজনৈতিক মহলেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে অন্য একটি সম্ভাবনাকে ঘিরে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-র নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার নাকি তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের শেষ চার বছরের নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব নিরীক্ষক বা সিএজি (CAG) রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করতে চলেছে।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, সিএজি হল দেশের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা সংস্থা। কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন দফতরের আয়-ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে তারা নিরীক্ষা চালায়। কোনও রিপোর্ট তৈরি হলেই তা জনসমক্ষে আসে না। সংশ্লিষ্ট আইনসভায় রিপোর্ট পেশ হওয়ার পরই তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্য নথি হয়ে ওঠে।

খবর অনুযায়ী, তৃণমূল সরকারের আমলে শেষ যে সিএজি রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ হয়েছিল, তা ছিল ২০২০-২১ অর্থবর্ষের। এরপর ২০২১-২২, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের রিপোর্ট বিধানসভায় উপস্থাপিত হয়নি। ফলে চার বছরের নিরীক্ষা রিপোর্ট কার্যত জনসমক্ষে আসেনি।

বিজেপি সরকারের যুক্তি হতে পারে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির স্বার্থে এই রিপোর্টগুলি প্রকাশ করা জরুরি। কারণ সিএজি রিপোর্টে সরকারি প্রকল্পের আর্থিক শৃঙ্খলা, ব্যয়ের বৈধতা, বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার নানা দিক উঠে আসে। রিপোর্টে যদি গুরুতর পর্যবেক্ষণ থাকে, তাহলে তা রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

প্রসঙ্গত, অতীতেও সিএজি রিপোর্ট নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে তীব্র সংঘাত হয়েছে। ২০২৪ সালে একটি সিএজি রিপোর্টকে সামনে রেখে বিজেপি তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল। অন্যদিকে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই রিপোর্টকে “ভুল” ও “যথাযথ যাচাই ছাড়া তৈরি” বলে দাবি করেছিলেন।

এবার পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। কারণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং বিধানসভায় এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিধানসভার বিরোধী শিবিরও বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। তৃণমূলের মধ্যে বিদ্রোহ, আলাদা গোষ্ঠীর উত্থান এবং বিরোধী বেঞ্চে বিভক্ত অবস্থান ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক অধিবেশনে বিদ্রোহী ও অনুগত বিধায়কদের আলাদা বসতে দেখা গেছে।

এই অবস্থায় সিএজি রিপোর্ট পেশ হলে রাজনৈতিক অভিঘাত আরও বাড়তে পারে। কারণ রিপোর্টে যদি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, বরাদ্দ অর্থের অপব্যবহার, অব্যবহৃত তহবিল, অসম্পূর্ণ কাজ বা প্রশাসনিক গাফিলতির উল্লেখ থাকে, তাহলে বিজেপি তা বিরোধীদের বিরুদ্ধে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের সামনে এটি দ্বিমুখী সুযোগ। একদিকে তারা দাবি করতে পারবে যে পূর্ববর্তী সরকারের আর্থিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে নতুন করে জনসমক্ষে তুলে ধরা যাবে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টি সরকারের বিরুদ্ধে সিএজি রিপোর্টকে যেভাবে বিজেপি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, পশ্চিমবঙ্গেও তেমন কৌশল দেখা যেতে পারে।

তবে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক গুরুত্বও কম নয়। সিএজি রিপোর্ট কেবল দুর্নীতির অভিযোগের নথি নয়; এগুলি সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার মূল্যায়নও করে। ফলে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে অর্থনীতি, অবকাঠামো, সামাজিক প্রকল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নানা খুঁটিনাটি তথ্য সামনে আসতে পারে।

চলতি অধিবেশন ২৫ জুন পর্যন্ত চলবে এবং পরে জুলাই মাসে আবার শুরু হবে। তার মধ্যেই রিপোর্টগুলি টেবিলে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে সরকারি মহলে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা হয়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বাজেট অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠতে পারে এই সিএজি রিপোর্ট পেশের সিদ্ধান্ত।

যদি সত্যিই চার বছরের রিপোর্ট একসঙ্গে বিধানসভায় পেশ হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক নথি প্রকাশের ঘটনা হবে না; বরং পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তৃণমূল আমলের আর্থিক ও প্রশাসনিক উত্তরাধিকারের এক বিস্তৃত হিসাব-নিকাশও শুরু করবে।