হাইলাইটস:
- ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছিল, যাদের অধিকাংশই শিশু।
- ঘটনার চার মাস পরেও পেন্টাগন হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি।
- অভিযোগ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বে বেসামরিক হতাহতের জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল করা হয়েছে।
- প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সাত বছর পুরনো ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্কুলটিকে আইআরজিসি ঘাঁটি বলে মনে করা হয়েছিল।
- মানবাধিকার সংগঠন ও মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চার মাস পেরিয়ে গেলেও, কেন এই হামলা ঘটল এবং কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক শিশু নিহত হল, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি। অন্তত ১৭৫ জনের প্রাণহানির এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনাগুলির একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও হামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। সমালোচকদের আশঙ্কা, তদন্তের ফলাফল হয়তো গোপন নথির আড়ালে চাপা পড়ে যাবে, যাতে মার্কিন প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর গুরুতর ভুল জনসমক্ষে না আসে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এই হামলার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে বলেন, “এটা অনেক আগের ঘটনা। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেনি। যুদ্ধের সময় ভুল হতেই পারে।” তাঁর এই মন্তব্য নিহত শিশুদের পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
হামলাটি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্যালয় ভবনে পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। প্রথম বিস্ফোরণে বহু শিশু নিহত হয়। পরে আহতদের উদ্ধার করতে বা স্বজনদের খুঁজতে যারা ফিরে আসে, দ্বিতীয় বিস্ফোরণে তাদের অনেকেও প্রাণ হারায়। এই ধরনের হামলাকে সামরিক পরিভাষায় “ডাবল ট্যাপ” আক্রমণ বলা হয়।
মোহাম্মদরেজা আহমাদি তিফাকানি নামের এক শোকাহত পিতা ওই হামলায় তাঁর সাত বছরের মেয়ে হানিয়েহ এবং দশ বছরের ছেলে সোবহানকে হারিয়েছেন। তিনি জানান, প্রথম বিস্ফোরণে মেয়েটি মারা যায়। ছেলে সোবহান বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু বোনকে খুঁজতে ফিরে এসে দ্বিতীয় বিস্ফোরণে নিহত হয়। মরদেহ শনাক্ত করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর সন্তানের দেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে সেই দৃশ্য কখনও ভোলার নয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, তদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে উঠে এসেছে যে সেনাবাহিনী সাত বছর পুরনো লক্ষ্যবস্তুর তথ্য ব্যবহার করেছিল। সেই তথ্য অনুযায়ী এলাকাটিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সেখানে একটি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বহু আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন বলে জানা গেলেও, লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি।
এদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি পেন্টাগনের বেসামরিক হতাহতের মূল্যায়ন ও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল করেছেন। তাঁর “অ্যান্টি-ওয়োক” সংস্কারের অংশ হিসেবে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনার জন্য গঠিত একাধিক ইউনিট বন্ধ বা সংকুচিত করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া সিদ্ধান্তের উপর স্বাধীন নজরদারি অনেকটাই কমে গেছে।
পেন্টাগনের সাবেক একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে এই তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশের সম্ভাবনা খুবই কম। তাঁদের মতে, অতীতে কুন্দুজ হাসপাতাল বোমা হামলা, মসুলে গণহত্যাসদৃশ বিমান হামলা কিংবা ইরাকের আমিরিয়াহ আশ্রয়কেন্দ্রে বোমাবর্ষণের মতো ঘটনায় অন্তত কিছু মাত্রায় তদন্ত ও জবাবদিহি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু মিনাবের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হচ্ছে না।
অ্যারিজোনার কংগ্রেস সদস্য এবং ইরানি-আমেরিকান রাজনীতিক ইয়াসমিন আনসারি বলেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বারবার ব্যাখ্যা চেয়েছেন, কিন্তু কার্যত কোনও উত্তর পাননি। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসন সত্য গোপন করছে এবং দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর কর্মকর্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষার জন্য যে নিয়ম ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ায় এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেড়েছে।
চার মাস পরও মিনাবের ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। কিন্তু তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া এবং মার্কিন প্রশাসনের অনীহার কারণে সেই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। নিহতদের স্বজনদের আশঙ্কা, বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেলে এই ঘটনার প্রকৃত সত্য হয়তো আর কখনও প্রকাশ্যে আসবে না।