বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক মোড় নিল। টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালী কার্যত আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্র চলাচলের প্রচলিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই হামলাগুলির উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানোর ক্ষমতা নষ্ট করা। এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, এই অভিযান ইরানের ওপর বড় মূল্য চাপিয়ে দেবে এবং তাদের আক্রমণাত্মক শক্তি ক্ষয় করবে।

হামলার আগে ট্রাম্প রক্ষণশীল রেডিও সঞ্চালক হিউ হিউইটকে বলেন, “আজ রাতে আমরা ওদের খুব জোরে আঘাত করব, আগামীকালও করব। তারা কিছুই করতে পারবে না। তাদের কাছে বড় বড় কথা ছাড়া আর কিছুই নেই।”

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি জানিয়েছে, ওমানের জলসীমার মধ্যে হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ অংশে তাদের দুটি তেলবাহী জাহাজে ইরানের দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন এবং আটজন আহত হন। আহতদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।

সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বেড়েছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭.৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮১.৯২ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও যুদ্ধের শুরুর সময় যে ১২০ ডলারের বেশি হয়েছিল, এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এর আগে সোমবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেসব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করবে, তাদের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে আমেরিকা। তিনি এমনকি বলেন, ভবিষ্যতে আমেরিকাকে “হরমুজ প্রণালীর অভিভাবক” হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এই অবস্থান মার্কিন প্রশাসনের আগের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এতদিন ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল, আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব দেশের জাহাজের অবাধ ও বিনামূল্যে চলাচলের অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনে এই ধরনের পথ ব্যবহার করতে কোনও রাষ্ট্র একতরফাভাবে টোল বা শুল্ক আরোপ করতে পারে না।

উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর যুদ্ধের সূচনা হয়। পরে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে ৬০ দিনের জন্য সংঘাত কমিয়ে স্থায়ী সমাধানের আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ-অভিযানের পাল্টাপাল্টি ঘটনায় যুদ্ধবিরতি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সোমবার আরও জানা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন ৭ জুলাই থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে বলে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর ফলে যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট আরও ৬০ দিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান চালাতে পারবেন।

তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। যদিও অতীতে বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট সীমিত সময়ের সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে নির্বাহী ক্ষমতার দাবি করেছেন। যুদ্ধক্ষমতা আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয় এবং কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে ৬০ দিনের মধ্যে অভিযান শেষ করতে হয়। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকানও অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আইনটির অপব্যাখ্যা করছে।

সোমবার রাতে মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র জানায়, মঙ্গলবার রাত থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধ কার্যকর করা হবে। ইরানের সব বন্দর, তেল টার্মিনাল ও উপকূলীয় এলাকা এই অবরোধের আওতায় থাকবে।

সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া অবরুদ্ধ এলাকায় প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে যে কোনও জাহাজকে থামানো, পথ পরিবর্তনে বাধ্য করা কিংবা আটক করা হতে পারে। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগও করা হবে। তবে যেসব জাহাজের গন্তব্য ইরান নয়, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরপেক্ষভাবে চলাচল করলে বাধা দেওয়া হবে না।

তবে বাস্তবে এত বড় সমুদ্রপথে এই অবরোধ কতটা কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ট্রাম্পের ২০ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব আরও বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ গত মাসেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে চলাচলের জন্য কোনও দেশ টোল বা ফি নিতে পারে না। সেটাই আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পাল্টা অভিযোগ করেছে, আমেরিকার এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওয়াশিংটনের যে কোনও পদক্ষেপের কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং ইরান এই প্রণালীর ওপর নিজের সার্বভৌম অধিকার বজায় রাখবে।

এদিকে রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য বাধ্যতামূলক শুল্ক আরোপের কোনও আইনি ভিত্তি নেই। সংস্থার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালীতে একতরফাভাবে টোল বসানোর বিরুদ্ধে আইএমও বরাবরই অবস্থান নিয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প আরও একধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, আমেরিকা সম্ভবত হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেবে এবং এই জলপথ পরিচালনার বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা প্রণালীটি নিজেদের হাতে রাখব, সম্ভবত আমরা সেটাই পরিচালনা করব।”

ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা বার্তায় লেখেন, “একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম— প্রতিশ্রুতি রাখুন, না হলে মূল্য দিতে হবে।”

এদিকে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান একাধিক দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। রবিবার প্রথমবারের মতো কাতারেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যদিও সেই দেশটি যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।

ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই সংঘাতে প্রধানত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধি আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।