হাইলাইটস:
- বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টে তৃণমূলের মামলা।
- বিচারপতি কৃষ্ণ রাও প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনৈতিক দলের সম্মতি ছাড়া স্পিকার কি কাউকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন?
- তৃণমূলের দাবি, দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।
- ঋতব্রত ও সন্দীপন সাহা দল থেকে বহিষ্কৃত, তাই তাঁদের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া বেআইনি।
- স্পিকারের পক্ষে রাজ্যের বক্তব্য, মামলার নথি অসম্পূর্ণ এবং সিদ্ধান্ত খারিজের নির্দিষ্ট আবেদনও নেই।
- আগামী ১৬ জুন মামলার পরবর্তী শুনানি।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা পদ নিয়ে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা এখন কেবল একটি সাংবিধানিক বা প্রক্রিয়াগত বিতর্ক নয়; এটি কার্যত তৃণমূল কংগ্রেসের ভিতরে কার হাতে বৈধতা থাকবে, সেই প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্টে এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের একাধিক পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে।
মামলার কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু তাঁকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
দলের তরফে দাবি করা হয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনের পর ৬ মে তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা পদে মনোনীত করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত স্পিকারকে ৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল। অতীতের রীতি ও নজির অনুসারে স্পিকারের সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয় যখন ৩ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে ৫৯ জন বিধায়কের একটি গোষ্ঠী স্পিকারের কাছে নিজেদের সমর্থনের তালিকা জমা দেয়। এরপর স্পিকার ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
আদালতে তৃণমূলের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যুক্তি দেন, বিরোধী দলনেতা নির্বাচন শুধুমাত্র বিধায়কদের সংখ্যার অঙ্ক নয়। তিনি বলেন, বিরোধী দলনেতা আসলে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। ফলে কেবল আইনসভার দলের সমর্থন থাকলেই হবে না, রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও জরুরি।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের মূল দর্শনই হল রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া। আইনসভার দল রাজনৈতিক দলের উপরে নয়। ফলে দল যাঁকে স্বীকৃতি দেয়নি, তাঁকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নেওয়া সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী।
তিনি আদালতে বলেন, “ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা দু’জনেই দল থেকে বহিষ্কৃত। তাঁরা বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জও করেননি। তাহলে কীভাবে তাঁদের একজনকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়?”
এই যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, রাজনৈতিক দলের অনুরোধ উপেক্ষা করে স্পিকার কি শুধুমাত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি মেনে কাউকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন?
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ছিল, “যিনি বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন, তিনি তো বর্তমানে দলের সদস্যই নন।”
এই মন্তব্যকে অনেকেই তৃণমূলের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ নৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন। কারণ আদালত অন্তত প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে বলে মনে হয়েছে।
তবে স্পিকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নেন। তিনি আদালতকে জানান, মামলায় পর্যাপ্ত নথি নেই। স্পিকারের যে সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, সেই আদেশের কপিও সংযুক্ত করা হয়নি।
তাঁর বক্তব্য, বিধানসভার নথি পাওয়ার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে এবং সেই পদ্ধতি অনুসরণ না করেই আদালতে আসা হয়েছে। তিনি আদালতের কাছে সময় চান যাতে স্পিকারের সিদ্ধান্ত-সহ সমস্ত নথি হলফনামা আকারে পেশ করা যায়।
বিল্বদল ভট্টাচার্য আরও বলেন, মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ আবেদনকারীরা স্পিকারের সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য স্পষ্ট প্রার্থনা করেননি।
এই অবস্থায় বিচারপতি কোনও অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেননি। তবে মামলাটি খারিজও করেননি। বরং উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার জন্য ১৬ জুন পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে এই মামলার গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এটি শুধু বিরোধী দলনেতার কক্ষ বা মর্যাদা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তৃণমূলের ভাঙনের প্রশ্ন, ৫৯ জন বিধায়কের বৈধতা, এবং সবচেয়ে বড় কথা—দলের উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার।
যদি আদালত শেষ পর্যন্ত মনে করে যে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তাহলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী দলনেতা পদ বিপদের মুখে পড়তে পারে। আবার যদি আদালত আইনসভার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেই প্রধান বলে ধরে, তাহলে তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য তা হবে বড় ধাক্কা।
সুতরাং এই মামলা এখন আর নিছক একটি বিধানসভা-সংক্রান্ত বিরোধ নয়। এটি কার্যত পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব এবং দলীয় বৈধতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ১৬ জুনের শুনানি তাই শুধু আদালত নয়, রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনও গভীর আগ্রহে পর্যবেক্ষণ করবে।