হাইলাইটস:

  • তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, দলের ভাঙন এখনও শেষ হয়নি।
  • তাঁর মতে, বিদ্রোহী বিধায়কদের সংখ্যা শীঘ্রই ৬৭-৬৮-তে পৌঁছতে পারে।
  • লোকসভায়ও ২০-২২ জন সাংসদ বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে দাবি।
  • এবার লক্ষ্য পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং জেলা সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
  • ঋতব্রতের বক্তব্য, “বিধায়ক, সাংসদ ও সংগঠনের বড় অংশ আমাদের সঙ্গে। তাহলে আসল দল কোনটি, সেই প্রশ্ন উঠবেই।”

তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ক্রমশ আরও গভীর রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ ঘিরে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর এবার বিদ্রোহী শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি ইঙ্গিত দিলেন, তাঁর লক্ষ্য শুধু বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নয়, গোটা তৃণমূল সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া।

এক সাক্ষাৎকারে ঋতব্রত স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এখনও থামেনি। বরং আগামী দিনে আরও বিধায়ক তাঁদের শিবিরে যোগ দিতে পারেন বলে তিনি মনে করছেন। তাঁর দাবি, বর্তমানে যে শক্তি তাঁদের হাতে রয়েছে, তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭ বা ৬৮ জন বিধায়কের সমর্থনে পৌঁছতে পারে।

ঋতব্রতের কথায়, “এখনও অনেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রকাশ্যে আসেননি। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা যেদিকে যাচ্ছে, তাতে আরও কয়েকজন আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন বলেই আমি মনে করি।”

এই বক্তব্য এমন সময় সামনে এসেছে, যখন তৃণমূলের অন্দরে নেতৃত্বের প্রশ্ন নিয়ে অসন্তোষের খবর নিয়মিত প্রকাশ্যে আসছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই দলের ভেতরে নানা স্তরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিদ্রোহী শিবিরের অভিযোগ, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ক্রমশ কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতামতের গুরুত্ব কমেছে।

ঋতব্রতের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল সাংসদদের প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেছেন, লোকসভায় তৃণমূলের বড় অংশের সাংসদও বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন।

তাঁর বক্তব্য, “২০ থেকে ২২ জন সাংসদ ওদের বিরুদ্ধে। তাহলে আর বাকি থাকছে কী? বিধায়কদের বড় অংশ আমাদের সঙ্গে। সাংসদদের বড় অংশও অসন্তুষ্ট। রাজনৈতিক বাস্তবতা মানুষ নিজেরাই বুঝে নিতে পারবেন।”

যদিও এই দাবির কোনও আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও রাজনৈতিক মহলে বহুদিন ধরেই জল্পনা রয়েছে যে তৃণমূলের একাংশ কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। বিশেষ করে নির্বাচনী পরাজয়ের পরে অনেক সাংসদ ও বিধায়ক নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে ঋতব্রতের পরিকল্পনা শুধুমাত্র বিধানসভা বা সংসদের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার, আগামী পর্যায়ে লড়াই হবে সংগঠনের ভিতরে।

তিনি বলেছেন, এবার তাঁদের নজর থাকবে পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং জেলা সংগঠনগুলির দিকে। কারণ রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি আইনসভায় নয়, তৃণমূল স্তরের সংগঠনে।

ঋতব্রতের মতে, “জেলা সভাপতি, ব্লক নেতৃত্ব, পুরসভার কাউন্সিলর এবং পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। অনেকেই যোগাযোগ রাখছেন। আগামী দিনে জেলা ইউনিট এবং নাগরিক সংস্থাগুলিতে পরিবর্তন দেখা যাবে।”

এই মন্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল তার বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে জেলা পরিষদ, পুরসভা থেকে মহানগর—সব স্তরেই দলটি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধায়কদের সমর্থন পাওয়া এক বিষয়, কিন্তু সংগঠনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ। বহু জেলা ও ব্লক স্তরে এখনও পুরনো নেতৃত্বের প্রভাব রয়েছে। ফলে সংখ্যার হিসাব এবং বাস্তব সাংগঠনিক শক্তির মধ্যে পার্থক্য থেকে যেতে পারে।

তবুও ঋতব্রত আত্মবিশ্বাসী। তাঁর দাবি, পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। নেতাকর্মীরা বুঝতে পারছেন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের অবস্থানও বদলাচ্ছেন।

তিনি বলেন, “মানুষ এবং কর্মীরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। যেখানে রাজনৈতিক সম্ভাবনা থাকে, সেখানেই সমর্থন সরে যায়। এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম।”

অন্যদিকে তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব এখনও এই দাবিগুলিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলীয় শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য, কয়েকজন অসন্তুষ্ট নেতা দল ছেড়ে গেলেই তৃণমূলের ভিত্তি ভেঙে পড়বে না। তাঁদের মতে, দলের সংগঠন এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে বৃহত্তর চিত্র বিচার করা ঠিক হবে না।

কিন্তু বাস্তবতা হল, গত কয়েক সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনীতি গড়ে তোলার পরিবর্তে দলটি এখন নিজেদের অস্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রশ্নে ব্যস্ত।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সংকটকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তাঁর বক্তব্যে কেবল আত্মবিশ্বাস নয়, গোটা দলকে পুনর্গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছে। তিনি নিজেকে আর শুধুমাত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মুখ হিসেবে তুলে ধরছেন না; বরং তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

আগামী দিনে এই লড়াই শুধু বিধানসভা বা লোকসভায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। জেলা কমিটি, ব্লক সংগঠন, পুরসভা, পঞ্চায়েত—সব স্তরেই তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। প্রশ্ন একটাই—তৃণমূল কি এই সংকট কাটিয়ে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে, নাকি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলটির ভিতর থেকেই গড়ে উঠবে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র?

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে এটুকু স্পষ্ট, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ লড়াই এখন আর কেবল কয়েকজন নেতা বা বিধায়কের বিরোধ নয়; তা ক্রমশ গোটা দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সংগ্রামে পরিণত হচ্ছে।