Table of Contents
হাইলাইটস:
- বিধানসভায় আলাদা কক্ষ ও আলাদা বক্তব্যের সময় চাইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত বিধায়করা।
- বিরোধী শিবিরের ভাঙন এখন কার্যত বিধানসভার অভ্যন্তরেও প্রকাশ্যে।
- ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং মমতা-অনুগত শিবিরের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র।
- স্পিকারের সামনে নতুন সাংবিধানিক ও বিধানিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা।
বিধানসভার অন্দরেই দুই তৃণমূল
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নতুন অধিবেশন শুরু হতেই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকাশ্যে চলে এল। দলীয় বিভাজন এখন শুধু সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম নয়, বিধানসভার কার্যক্রমেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অনুগত বিধায়করা এবার বিধানসভায় নিজেদের জন্য পৃথক কক্ষ এবং আলোচনায় আলাদা বক্তব্য রাখার সময় বরাদ্দের দাবি তুলেছেন।
এই দাবি কার্যত স্বীকার করে নিচ্ছে যে বিরোধী শিবির আর একক সত্তা হিসেবে কাজ করছে না। একদিকে রয়েছেন মমতা-ঘনিষ্ঠ বিধায়করা, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যারা ইতিমধ্যেই নিজেদের পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়েছে।
কেন উঠল এই দাবি?
মমতা-অনুগত বিধায়কদের অভিযোগ, বিধানসভায় বিরোধী দলের স্বীকৃতি এবং আসন বিন্যাস সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাদের মতামতকে উপেক্ষা করেছে। তাদের বক্তব্য, বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে কার্যত বিরোধী শিবিরের মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, অথচ নির্বাচনী ম্যান্ডেট পেয়েছিলেন তাঁরা তৃণমূলের প্রতীকেই।
ফলে একই কক্ষে বসে কিংবা একই সময় ভাগ করে নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। দলীয় নীতি, সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান, এমনকি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে বিস্তর পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে মমতা-ঘনিষ্ঠ বিধায়কদের দাবি, তাঁদের একটি স্বতন্ত্র ব্লক হিসেবে বিবেচনা করা হোক এবং বিধানসভার আলোচনায় বক্তব্য রাখার জন্য পৃথক সময় বরাদ্দ করা হোক।
স্পিকারের সামনে নতুন পরীক্ষা
এই দাবি মেনে নেওয়া হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ বিধানসভার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সময় সাধারণত দলীয় শক্তি এবং স্বীকৃত গোষ্ঠীর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
যদি স্পিকার মমতা-অনুগত শিবিরকে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেন, তাহলে কার্যত বিরোধী শিবিরের বিভাজনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আবার যদি সেই দাবি খারিজ করা হয়, তাহলে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
ইতিমধ্যেই বিরোধী দলনেতা সংক্রান্ত বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিধানসভার অভ্যন্তরে আসন, কক্ষ এবং বক্তব্যের সময় নিয়ে নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সংখ্যার লড়াই থেকে মর্যাদার লড়াই
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সুবিধা বা বসার জায়গার প্রশ্ন নয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক মর্যাদা এবং বৈধতার লড়াই।
বিদ্রোহী শিবির দাবি করছে, তাদের সঙ্গেই অধিকাংশ বিরোধী বিধায়ক রয়েছেন এবং সেই কারণে বিরোধী রাজনীতির প্রধান প্রতিনিধিত্বের অধিকারও তাদের। অন্যদিকে মমতা-অনুগতরা বলছেন, সংগঠনের মূল নেতৃত্ব, আদর্শ এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারক তাঁরাই।
ফলে আলাদা ঘরের দাবি আসলে একটি প্রতীকী বার্তা—‘আমরা আলাদা, এবং আমাদের কণ্ঠস্বরও আলাদা’।
বাজেট অধিবেশনের আগে চাপানউতোর
২২ জুন রাজ্য সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হওয়ার কথা। তার আগে এই নতুন বিতর্ক রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজেট আলোচনায় কে কত সময় পাবে, কোন গোষ্ঠী সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান বক্তব্য রাখবে, কারা বিরোধী রাজনীতির মুখ হয়ে উঠবে—এসব প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী কয়েকদিনে স্পিকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ সেই সিদ্ধান্ত শুধু বিধানসভার দৈনন্দিন কাজকর্ম নয়, পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে।
সংকটের গভীরতা বাড়ছে
এক সময় যে দল রাজ্যের রাজনীতিতে প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল, সেই তৃণমূল আজ নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের অভিঘাত সামলাতে ব্যস্ত। আলাদা কক্ষ ও আলাদা বক্তব্যের সময়ের দাবি সেই সংকটেরই সর্বশেষ প্রকাশ।
বিধানসভার করিডরে এখন প্রশ্ন একটাই—এ কি সাময়িক মতভেদ, নাকি তৃণমূলের ভাঙনের পথে আরও এক ধাপ? আগামী অধিবেশনের ঘটনাপ্রবাহই তার উত্তর দেবে।