ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলস্ফিয়ার: ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং সেখানকার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন তুমুল সমালোচনা চলছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন একটি বিতর্ক সামনে নিয়ে এলো ইসরায়েল। ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন—বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন ‘হামাস’-এর তৎপরতা রয়েছে এবং তারা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য বা গোয়েন্দা প্রতিবেদন ছাড়াই এমন একটি স্পর্শকাতর দাবি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হামাসের মতো একটি ফিলিস্তিন-কেন্দ্রিক গোষ্ঠী, যাদের মূল লক্ষ্য নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করা, তারা হাজার মাইল দূরের দক্ষিণ এশিয়ায় কেন তৎপরতা চালাতে যাবে? আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য মনে হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে রয়েছে গভীর কূটনৈতিক সমীকরণ।
গাজা সংকট থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের শুনানি চলছে, তখন তেল আবিব এক ধরনের বৈশ্বিক কূটনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপ সামাল দিতেই তারা ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ পুরোনো বয়ানকে নতুন করে সামনে আনতে চাইছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের উপস্থিতির কথা বলে তারা মূলত আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে চায় যে, ইসরায়েল শুধু নিজের সীমানায় নয়, বিশ্বজুড়েই হুমকির মুখে রয়েছে। এটি মূলত গাজার মূল সংকট থেকে পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ সরানোর একটি কৌশল হতে পারে।
নয়াদিল্লির মাটিতে বসে দেওয়া বার্তা
এই সাক্ষাৎকারটি দেওয়া হয়েছে দিল্লিতে বসে এবং একটি শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় গণমাধ্যমে। ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরেই তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর (বিশেষ করে পাকিস্তান) ভূখণ্ডে চরমপন্থার উত্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সোচ্চার। ইসরায়েলি দূত এই দাবি তুলে মূলত ভারতের সেই পুরোনো নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করলেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সাথে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সামরিক অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টা স্পষ্ট।
বাংলাদেশের ফিলিস্তিন নীতি ও অপপ্রচারের ঝুঁকি
বাংলাদেশের সাথে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবির প্রতি নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। গাজা ইস্যুতেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সরকার সবসময় ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই নৈতিক ও মানবিক সমর্থনকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ‘চরমপন্থায় মদদ’ বা ‘হামাসের প্রতি সহানুভূতি’ হিসেবে চিত্রিত করার একটি অপচেষ্টা এই বক্তব্যের মধ্যে থাকতে পারে। বাস্তবে বাংলাদেশে ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি সমাবেশ হলেও, এখানে হামাসের কোনো ধরনের সাংগঠনিক, আর্থিক বা সামরিক উপস্থিতির প্রমাণ আজ পর্যন্ত কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা পায়নি। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও হামাস কোনো বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বা আন্তর্জাতিক সশস্ত্র গোষ্ঠী নয় যে তারা দূরবর্তী কোনো দেশে শাখা বিস্তার করবে।
পাকিস্তানের ‘ইরান সমীকরণ’ ও পশ্চিমা চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষ হলো ইরান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পর্দার আড়ালের কিছু আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েলকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামাসকে আশ্রয় দেওয়া বা ইহুদিবিদ্বেষী মনোভাব ছড়ানোর অভিযোগ তুলে ইসরায়েল মূলত পশ্চিমা মিত্রদের কাছে ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে, যাতে পাকিস্তানের ওপর নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা যায়।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত?
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ প্রমাণহীন হলেও একে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ কম। কারণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে এ ধরনের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার ওয়াশিংটন বা ইউরোপীয় দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের কাছে বিভ্রান্তিকর বার্তা পাঠাতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিংবা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নীরব না থেকে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এই দাবির স্পষ্ট জবাব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই ভিত্তিহীন দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানানো। একই সাথে ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার—যে ফিলিস্তিনের প্রতি ঢাকার সমর্থন সম্পূর্ণ আইনি ও মানবিক, এবং দেশের মাটিতে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক সশস্ত্র বা চরমপন্থী গোষ্ঠীর বিন্দুমাত্র স্থান নেই।
প্রমাণহীন এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য কেবল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নষ্ট করবে না, বরং ভূ-রাজনীতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার জন্ম দেবে। তাই কৌশলগত কারণেই এই অপপ্রচারের কড়া কূটনৈতিক জবাব দেওয়াই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ পদক্ষেপ।
[বাংলস্ফিয়ার ডেস্ক / ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ]