Home স্বাস্থ্য মস্তিষ্কে কি একটাই ‘ভাষা-ইঞ্জিন’? নতুন গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ ইঙ্গিত

মস্তিষ্কে কি একটাই ‘ভাষা-ইঞ্জিন’? নতুন গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ ইঙ্গিত

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • দ্বিভাষিক মানুষের মস্তিষ্কে দুটি ভাষা প্রক্রিয়াকরণের ধরন আশ্চর্যজনকভাবে একরকম।
  • ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষাভাষীদের উপর গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাকরণের নিয়ম প্রয়োগের সময় মস্তিষ্ক প্রায় একইভাবে কাজ করে।
  • অর্থহীন বা কাল্পনিক শব্দের ক্ষেত্রেও একই স্নায়বিক প্যাটার্ন দেখা গিয়েছে।
  • গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কে হয়তো একটি অভিন্ন ‘ব্যাকরণ ইঞ্জিন’ রয়েছে, যা একাধিক ভাষা সামলাতে পারে।
  • এই আবিষ্কার ভাষা শেখা ও মস্তিষ্কের নমনীয়তা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।

আপনি যদি সারাজীবন কোনও একটি ভাষায় কথা বলে থাকেন, তাহলে সেই ভাষার ব্যাকরণের নিয়মগুলি আপনার মস্তিষ্কে গভীরভাবে গেঁথে যায়। তাই কোনও অচেনা শব্দ শুনলেও অনেক সময় মানুষ আন্দাজ করতে পারে সেটির বিভিন্ন রূপ কী হবে। অর্থাৎ ভাষার নিয়মগুলি আমাদের অজান্তেই মস্তিষ্কে কাজ করে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, যারা একাধিক ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের মস্তিষ্ক প্রতিটি ভাষাকে আলাদা আলাদা স্নায়বিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ করে। কারণ বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণ, শব্দগঠন ও বাক্যরীতি একে অপরের থেকে অনেকটাই আলাদা।

কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দ্বিভাষিক মানুষের মস্তিষ্কে দুটি ভাষা ব্যবহার করার সময় স্নায়বিক কার্যকলাপের মধ্যে বিস্ময়কর মিল রয়েছে।

গবেষণাটি করেছেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ও স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. এস্টি ব্লাঙ্কো-এলোরিয়েটা এবং তাঁর সহকর্মীরা। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানপত্রিকা জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স-এ।

ড. ব্লাঙ্কো-এলোরিয়েটা বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম কিছু মিল পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এতটা মিল থাকবে তা স্পষ্ট ছিল না। এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে মস্তিষ্কে দুটি ভাষা কতটা গভীরভাবে একীভূত হয়ে কাজ করে।”

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানী ড. জুডিথ ক্রলের মতে, একসময় দ্বিভাষিকতাকে অনেকেই মাতৃভাষার উপর অতিরিক্ত চাপ বা বিঘ্ন হিসেবে দেখতেন। কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা যায়, একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্কে কিছু গঠনগত পরিবর্তন ঘটে। তাঁদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের দক্ষতাও অনেক ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে।

নতুন গবেষণায় অংশ নেন ২৩ জন ব্যক্তি, যাঁরা স্প্যানিশ ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই সাবলীল।

তাঁদের একটি বিশেষ স্ক্যানারের মধ্যে শুইয়ে রাখা হয়। এই যন্ত্রের নাম ম্যাগনেটোএনসেফালোগ্রাফি বা এমইজি। এটি প্রতি মিলিসেকেন্ডে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ছবি তুলতে পারে।

অংশগ্রহণকারীদের সামনে বিভিন্ন শব্দ দেখানো হয়। তারপর তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হয় শব্দটিকে একবচন বা বহুবচনে রূপান্তর করতে, অথবা কোনও পরিবর্তন না করে শুধু পুনরাবৃত্তি করতে।

যেমন, একটি শব্দ দেখানোর পর শোনানো হয় “এক” বা “দুই” ধরনের নির্দেশ। সেই অনুযায়ী শব্দের রূপ বদলাতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় মস্তিষ্কের কোন অংশ কীভাবে সক্রিয় হচ্ছে, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা।

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ।

ইংরেজি শব্দ হোক বা স্প্যানিশ শব্দ—ব্যাকরণগত পরিবর্তন করার সময় মস্তিষ্কে প্রায় একই ধরনের স্নায়বিক কার্যকলাপ দেখা যায়।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই মিল শুধু সেইসব শব্দের ক্ষেত্রে নয় যেগুলি দুই ভাষায় প্রায় একই রকম। এমনকি সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ বা অর্থহীন কল্পিত শব্দের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে।

গবেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে যে মস্তিষ্ক শব্দের অর্থ বা মুখস্থ শব্দভাণ্ডারের উপর নির্ভর না করে, ব্যাকরণের মূল নিয়মগুলিকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করে।

ড. ব্লাঙ্কো-এলোরিয়েটা বলেন, “এতে মনে হচ্ছে মস্তিষ্ক হয়তো শব্দ নয়, বরং ব্যাকরণগত ক্রিয়াকেই আলাদা করে উপস্থাপন করছে।”

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. মিরজানা বোজিচ, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বলেন যে ফলাফলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, গবেষণাটি শক্তিশালী প্রমাণ দিয়েছে যে দ্বিভাষিক মানুষ বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করলেও একই স্নায়বিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেন।

গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, মস্তিষ্কের বাম দিকের সামনের অংশ ব্যাকরণগত কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই অংশটি সম্ভবত বিভিন্ন ভাষার জন্য একইভাবে কাজ করে।

তবে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা—যেমন বাংলা ও জাপানি, অথবা আরবি ও চীনা—সেক্ষেত্রেও কি একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ভবিষ্যতে আরও গবেষণা করতে চান বিজ্ঞানীরা।

তাঁরা শুধু শব্দের রূপান্তর নয়, বাক্যের গঠন, অর্থ বোঝা এবং জটিল ভাষাগত নিয়ম নিয়ে মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তাও পরীক্ষা করবেন।

ড. জুডিথ ক্রলের কথায়, “আমরা একসময় ভাবতাম মস্তিষ্কের ক্ষমতার সীমা অনেক কম। এখন দেখা যাচ্ছে, মস্তিষ্ক অনেক বেশি নমনীয় এবং অভিযোজনক্ষম। এটি সবসময় বদলাচ্ছে, নতুন কিছু শিখছে।”

এই গবেষণা তাই শুধু ভাষাবিজ্ঞানের জন্য নয়, মানবমস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের ধারণার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হয়তো ভবিষ্যতে ভাষা শেখার নতুন পদ্ধতি, এমনকি ভাষাজনিত রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এই আবিষ্কার কাজে লাগতে পারে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles