হাইলাইটস:
- তৃণমূল কংগ্রেসের ৫৯ জন বিদ্রোহী বিধায়ক বিধানসভায় গিয়ে আলাদা গোষ্ঠীর দাবি জানালেন।
- দলভাঙা বৈধ করতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশের সীমা অতিক্রম করেছে বিদ্রোহী শিবির।
- ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নতুন গোষ্ঠী বিরোধী দলের স্বীকৃতি দাবি করতে পারে।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ‘মহারাষ্ট্র মডেল’-এ দল ভাঙানোর অভিযোগ তুলেছেন।
- সাম্প্রতিক বৈঠক ও কর্মসূচিতে তৃণমূল বিধায়কদের উপস্থিতি ক্রমশ কমে আসা ভাঙনের পূর্বাভাস দিয়েছিল।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখা যায়নি। যে দল একসময় রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই তৃণমূল কংগ্রেস এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। বুধবার কলকাতার বিধানসভা চত্বরে যে রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ হল, তা শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং বাংলার রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যকেই বদলে দিতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসের ৫৯ জন বিদ্রোহী বিধায়ক একযোগে বিধানসভায় পৌঁছে নিজেদের পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। তাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন সন্দীপন সাহা-সহ একাধিক বিধায়ক, যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ উঠছিল।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই ৫৯ জনের মধ্যে রয়েছেন দলের বহু পরিচিত মুখ। প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ খান, অরূপ রায়, চন্দ্রনাথ সিনহা এবং সাবিনা ইয়াসমিনের মতো নেতাদের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এটি কয়েকজন অসন্তুষ্ট বিধায়কের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়। বরং তৃণমূলের সংগঠন ও নেতৃত্বের উপর গভীর আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
দলত্যাগ-বিরোধী আইনের ফাঁদ এড়াতে বিধানসভায় তৃণমূলের মোট সদস্যসংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। সম্প্রতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করার ফলে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০ থেকে কমে ৭৮-এ নেমে আসে। সেই হিসাবে বৈধ বিভাজনের জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত ৫২ জন বিধায়কের সমর্থন। বিদ্রোহীদের দাবি, মঙ্গলবারই ৫৭ জন সম্মতি দিয়েছিলেন। বুধবার সকালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯-এ।
অর্থাৎ, সংখ্যার নিরিখে তাঁরা শুধু প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রমই করেননি, বরং নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন।
বিধানসভায় প্রবেশের আগে সন্দীপন সাহার মন্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমাদের সঙ্গে বিধানসভার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য রয়েছেন। আগে বৈঠকটা হোক।”
এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, বিদ্রোহীরা আর কোনও আপসের পথে হাঁটতে আগ্রহী নন। তাঁদের লক্ষ্য এখন পৃথক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এবং বিধানসভার ভিতরে প্রধান বিরোধী গোষ্ঠীর মর্যাদা অর্জন করা।
আসলে গত এক মাস ধরে তৃণমূলের ভেতরে যে অস্থিরতা জমছিল, বুধবার তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে।
প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল ৬ মে। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ডাকা পরিষদীয় দলের বৈঠকে ৮০ জনের মধ্যে মাত্র ৬৯ জন উপস্থিত ছিলেন। তখনও অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।
কিন্তু ১৯ মে দ্বিতীয় বৈঠকে উপস্থিতির সংখ্যা নেমে আসে ৬৪-তে।
আর ৩১ মে তৃতীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১৯ জন বিধায়ক।
রাজনীতিতে সংখ্যা কখনও মিথ্যা বলে না। বৈঠকে ক্রমশ কমতে থাকা উপস্থিতি আসলে দলের ভিতরে চলতে থাকা অসন্তোষ ও দূরত্বেরই প্রতিফলন ছিল। বুধবারের ঘটনা প্রমাণ করে দিল, সেই অসন্তোষ অনেক আগেই সংগঠিত বিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল।
বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে সাবিনা ইয়াসমিনের অবস্থানেও। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলেই মনে করা হত। সেই নেত্রীই এখন বিদ্রোহী শিবিরে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচনের কথা বলছেন। এতে স্পষ্ট যে বিদ্রোহ শুধু সাংগঠনিক নয়, নেতৃত্বকেন্দ্রিকও।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে বিজেপির পরিকল্পিত অপারেশন বলে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
মঙ্গলবার ধর্মতলায় তাঁর প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ প্রয়োগ করছে। তাঁর দাবি, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিধায়কদের বাড়িতে পুলিশ যাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ভয় দেখিয়ে নতুন দল গঠনে উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, “মহারাষ্ট্রে যেমন শাসকদল ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, এখানেও একই চেষ্টা চলছে।” কিন্তু এই অভিযোগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, যদি শুধুমাত্র ভয় বা চাপই কারণ হত, তাহলে এত বড় সংখ্যায় বিধায়ক একযোগে বিদ্রোহে নামতেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মমতার প্রতিবাদ সভাতেই উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৯ জন সাংসদ ও বিধায়ক।
যে নেত্রী একসময় হাজার হাজার কর্মী-সমর্থককে রাস্তায় নামাতে পারতেন, তাঁর ডাকা কর্মসূচিতে এমন নগণ্য উপস্থিতি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে।
তৃণমূলের বর্তমান সংকটের আরেকটি দিকও রয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরে এমন বহু নেতা রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সিবিআই বা ইডির তদন্ত চলছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তথ্যকে সামনে এনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলছেন।
কিন্তু বিদ্রোহীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, নির্বাচনী পরাজয়ের পর দলের ভিতরে কোনও আত্মসমালোচনা হয়নি। নেতৃত্ব এখনও বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এখন সবার নজর বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর দিকে।
বিদ্রোহীদের জমা দেওয়া চিঠি এবং স্বাক্ষরের বৈধতা যাচাইয়ের পরই তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। যদি দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন সত্যিই প্রমাণিত হয়, তাহলে দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আলাদা স্বীকৃতি পেতে পারে এবং বিধানসভার বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
বাংলার রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—তৃণমূল কংগ্রেস কি কেবল একটি নির্বাচনী পরাজয়ের ধাক্কা সামলাচ্ছে, নাকি দলটি বাস্তবিক অর্থেই ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যাচ্ছে?
বুধবারের ঘটনাপ্রবাহ অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে যে দলটি গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আজ সেই দলই তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। আর এই সংকটের অভিঘাত শুধু তৃণমূলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা পশ্চিমবঙ্গের আগামী রাজনৈতিক সমীকরণও নতুন করে লিখতে পারে।