হাইলাইটস
- সংসদ অভিযানের সময় দিল্লির সানসদ মার্গে পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর জখম হন বহু আন্দোলনকারী।
- মুজফ্ফরনগরের ২৪ বছরের ই-রিকশাচালক রবি মাথায় একাধিক আঘাত পেয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ নিয়ে আরএমএল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি।
- সোমবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ১০০-রও বেশি আহতকে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে আনা হয়।
- অধিকাংশের মাথা, হাত ও পায়ে গুরুতর চোট, বহু জনের শরীরে লাঠির আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন।
- আহতদের পরিবার পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে, যদিও দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দিল্লির সংসদ অভিযানের দিনটি শেষ হয়েছে রক্তাক্ত ছবি, ভাঙা মাথা, ব্যান্ডেজে মোড়া হাত-পা এবং হাসপাতালের করিডরে উৎকণ্ঠিত আত্মীয়স্বজনের দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে। জাতীয় রাজধানীর রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সোমবার দুপুর থেকে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে ওঠে। একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্স এবং পুলিশ গাড়িতে করে আহত আন্দোলনকারীদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, দিনের শেষে ১০০-রও বেশি আহতকে সেখানে ভর্তি বা চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরের ২৪ বছরের যুবক রবি। পেশায় ই-রিকশাচালক রবি ছাত্র নন। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিতর্কে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়াতেই তিনি কয়েক দিন আগে দিল্লিতে আসেন। সেই সিদ্ধান্তই এখন তাঁকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রবির ভাই শ্যামের কথায়, সংসদ অভিযানের সময় প্রথমে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। আন্দোলনকারীরা কিছুটা পিছিয়ে গেলে শুরু হয় লাঠিচার্জ। সেই সময়ই এক পুলিশকর্মী রবির মাথায় বারবার লাঠি মারেন বলে অভিযোগ।
শ্যাম বলেন, “ওকে মাথায় বারবার মারা হয়। তারপরই ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আমরা কোনওরকমে ওকে হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
হাসপাতালের কর্তব্যরত নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট জানান, রবির মাথায় একাধিক আঘাতের ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। হাসপাতালে আনার সময় তিনি অচৈতন্য ছিলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। বর্তমানে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে।
রবির ঘটনাই একমাত্র নয়। আরএমএল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ আহতের শরীরে লাঠির আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। কারও মাথা ফেটে গিয়েছে, কারও হাত বা পা ভেঙেছে, আবার অনেকে চোখ, কাঁধ এবং পিঠে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, অনেকেরই মাথায় শক্ত আঘাত লাগায় সিটি স্ক্যান এবং স্নায়ু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হয়েছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে সারাদিন ভিড় জমিয়ে ছিলেন আহতদের আত্মীয়স্বজন এবং সহ-আন্দোলনকারীরা। কেউ রক্তের ব্যবস্থা করছেন, কেউ ওষুধ কিনছেন, আবার কেউ চিকিৎসকদের কাছ থেকে খবর জানার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। করিডরে বসে থাকা এক আন্দোলনকারী বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলাম। আচমকাই পরিস্থিতি বদলে যায়। তারপর আর কে কোথায় পড়ে গেল, কিছুই বোঝা যায়নি।”
আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমন মানুষও রয়েছেন, যাঁরা সরাসরি ছাত্র নন। কেউ চাকরিপ্রার্থী, কেউ দৈনিক মজুরির শ্রমিক, কেউ বা ছোট ব্যবসায়ী। তাঁদের বক্তব্য, দেশের পরীক্ষা ও নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই তাঁরা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।
চিকিৎসকদের একাংশ জানিয়েছেন, জরুরি বিভাগে এত অল্প সময়ে এত সংখ্যক আহত পৌঁছনোয় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স মোতায়েন করতে হয়। মাথায় আঘাত পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত স্ক্যান, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্নায়ু বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাঁদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ অযথা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে এবং মাথার মতো সংবেদনশীল অংশে লক্ষ্য করে লাঠি চালানো হয়েছে। তাঁদের দাবি, জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার নামে যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, তা ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
দিল্লি পুলিশের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। পুলিশের দাবি, সংসদমুখী মিছিলের সময় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা এবং নিরাপত্তা বলয় অতিক্রমের উদ্যোগ নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশের দাবি, বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন।
এই ঘটনার পর আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে গুরুতর আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাসও দিয়েছে সংগঠন।
আরএমএল হাসপাতালের আইসিইউতে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন রবি। তাঁর ভাইয়ের কথায়, “ও ছাত্র ছিল না। কিন্তু ছাত্রদের ভবিষ্যতের জন্য রাস্তায় নেমেছিল। এখন আমরা শুধু চাই, ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুক।”
সোমবারের এই রক্তাক্ত অধ্যায় শুধু একটি আন্দোলনের সংঘর্ষের ছবি নয়; এটি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল। আহতদের হাসপাতালের শয্যা এবং উদ্বিগ্ন পরিবারের অপেক্ষা এখন সেই প্রশ্নগুলিরই নীরব সাক্ষী।