হাইলাইটস:

  • দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা মোকাবিলায় কেন্দ্রের প্রধান কৌশল ছিল উপেক্ষা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নকরণ।
  • কৃষক আন্দোলনের পর প্রথমবার একটি অদলীয় জনআন্দোলন সরকারকে আলোচনার সংকেত দিতে বাধ্য করেছে।
  • সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং সি জে পি-র আন্দোলন দেখাল, নৈতিক চাপ এখনও ভারতীয় রাজনীতিতে কার্যকর হতে পারে।
  • সরকারের অবস্থান পুরোপুরি বদলে গেছে বলা যাবে না, কিন্তু প্রতিবাদকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার কৌশল যে সীমায় পৌঁছেছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে।
  • এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য নির্বাচনী ফল নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের গণতন্ত্রে গত এক দশকে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার সাধারণত বিরোধিতাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে নয়, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে প্রতিবাদ, আন্দোলন কিংবা বিরুদ্ধ মতের ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিক্রিয়া প্রায়শই তিনটি ধাপে এগিয়েছে—প্রথমে উপেক্ষা, তারপর আন্দোলনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, এবং শেষ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলার যুক্তিতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।

এই কৌশল বহু ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক বিক্ষোভ কিংবা আঞ্চলিক দাবিদাওয়া—অনেক ক্ষেত্রেই সরকার নিজের অবস্থান বদলায়নি। একমাত্র বড় ব্যতিক্রম ছিল কৃষক আন্দোলন। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সেই আন্দোলনের শেষে তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্র।

সেই কারণেই সিজেপি-র আন্দোলনকে কেবল আর একটি বিক্ষোভ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আন্দোলনের তাৎপর্য এই নয় যে সরকার সব দাবি মেনে নিয়েছে। বরং তাৎপর্য এই যে, সরকার প্রথমবার আলোচনার ইঙ্গিত দিতে বাধ্য হয়েছে এবং আন্দোলনকে পুরোপুরি অস্বীকার করার অবস্থানে থাকতে পারেনি।

এটি ভারতীয় রাজনীতিতে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

সি জে পি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর নৈতিক অবস্থান। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সোনম ওয়াংচুক—যিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ, শিক্ষা এবং জনস্বার্থের প্রশ্নে পরিচিত মুখ। তাঁর দীর্ঘ অনশন আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচলিত কাঠামো থেকে আলাদা করেছে।

সরকারের জন্য এটিকে সহজে “বিরোধী দলের চক্রান্ত” বলে খারিজ করা কঠিন ছিল।

আধুনিক রাজনীতিতে নৈতিক পুঁজির গুরুত্ব অনেক সময় সাংগঠনিক শক্তির চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে। ওয়াংচুক সেই নৈতিক পুঁজির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে এবং সরকারকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।

এখানেই আন্দোলনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সিজেপি কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল নয়। তাদের সংসদীয় শক্তি নেই, রাজ্য সরকার নেই, বিশাল সাংগঠনিক অবকাঠামোও নেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নৈতিক আবেদন—এই তিনের সমন্বয়ে তারা এমন একটি জনপরিসর তৈরি করতে পেরেছে, যা মূলধারার রাজনীতির বাইরে থেকেও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

গত এক দশকে সরকার যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তা হল—সংসদের বাইরে আন্দোলনের রাজনৈতিক কার্যকারিতা সীমিত।

সিজেপি সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে।

অবশ্য এই আন্দোলনের সাফল্যকে অতিরঞ্জিত করাও উচিত নয়।

সরকার এখনও তাদের মূল অবস্থান পরিবর্তন করেনি। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ হয়নি। সব দাবি মানা হয়নি। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপও বন্ধ হয়নি। তাই এটিকে সরকারের পরাজয় বলা বাস্তবসম্মত হবে না।

বরং বলা ভালো, এটি সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের একটি সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে।

প্রতিটি সরকারই জনমতের প্রতি সংবেদনশীল। প্রশ্ন হল, কোন পর্যায়ে সেই সংবেদনশীলতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। সি জে পি আন্দোলন দেখিয়েছে যে শুধুমাত্র প্রশাসনিক কঠোরতা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকে নৈতিক প্রশ্ন এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগ।

এই প্রসঙ্গে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা স্বাভাবিকভাবেই আসে।

দুটি আন্দোলনের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। কৃষক আন্দোলনের ছিল বিশাল সাংগঠনিক ভিত্তি, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ এবং স্পষ্ট অর্থনৈতিক দাবি। সিজেপি আন্দোলন তুলনায় অনেক ছোট, অনেক বেশি প্রতীকী এবং মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত।

কিন্তু দুটি আন্দোলনের মধ্যে একটি মিল রয়েছে।

দুটিই সরকারকে এই বার্তা দিয়েছে যে কেবল সময়ের ওপর ভরসা করে সব আন্দোলন নিঃশেষ হয়ে যায় না।

মোদী সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যের একটি বড় কারণ ছিল বিরোধীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা। বিভিন্ন প্রতিবাদকে কখনও আঞ্চলিক, কখনও দলীয়, কখনও মতাদর্শগত বলে আলাদা আলাদা করে মোকাবিলা করা হয়েছে। ফলে কোনও বৃহত্তর সামাজিক জোট তৈরি হতে পারেনি।

সিজেপি সেই কাঠামোয় একটি ফাটল তৈরি করেছে।

কারণ তাদের আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল পরীক্ষা, শিক্ষা, স্বচ্ছতা এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ—যে বিষয়গুলি দলীয় সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে। একজন ছাত্র, একজন অভিভাবক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক—রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে এই প্রশ্নগুলির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন।

এই কারণেই আন্দোলনের প্রভাব কেবল দিল্লির রাস্তায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ডিজিটাল পরিসরেও ছড়িয়ে পড়ে।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য।

সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অনেক সময় বিরোধী দল নয়, বরং এমন নাগরিক আন্দোলন, যাদের স্পষ্ট দলীয় পরিচয় নেই। কারণ রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ চালানো সহজ, কিন্তু নৈতিক দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের বিরুদ্ধে একই কৌশল সবসময় কার্যকর হয় না।

সিজেপি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

তবে ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই আন্দোলনের পরবর্তী পথচলার ওপর।

ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বহু আন্দোলন প্রথম ধাক্কায় ব্যাপক জনসমর্থন পেলেও পরে সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে শক্তি হারিয়েছে। তাই সিজেপি-র ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নৈতিক আবেগকে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর করা।

অন্যদিকে সরকারের সামনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

প্রতিবাদকে কি এখনও প্রধানত আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হবে, নাকি গণতান্ত্রিক সংলাপের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; তা নির্ধারণ করবে আগামী দশকে ভারতীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে।

সিজেপি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।

এটি প্রমাণ করেনি যে সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটিও প্রমাণ করেনি যে প্রতিবাদের মাধ্যমে যে কোনও সরকারকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব।

কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্য সামনে এনেছে—গণতন্ত্রে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সীমা শেষ পর্যন্ত জনমত। প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে প্রতিবাদকে দমন করা যায়, বিলম্বিত করা যায়, ক্লান্ত করা যায়; কিন্তু প্রতিটি আন্দোলনকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায় না।

কৃষক আন্দোলন সেই সীমারেখা একবার এঁকেছিল। সিজেপি আন্দোলন সেই সীমারেখার কথা আবারও মনে করিয়ে দিল। আর সেটিই সম্ভবত এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।