হাইলাইটস:

  • সেপ্টেম্বরের আগেই এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, নভেম্বরের মধ্যে ৯০ শতাংশ
  • বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, অন্তত মাঝারি মাত্রার, এমনকি শক্তিশালী এল নিনোও হতে পারে
  • রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সতর্কবার্তা: “উষ্ণায়নের আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে এল নিনো”
  • ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো ছিল ইতিহাসের পাঁচটি সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনার একটি
  • বিশ্বজুড়ে চরম তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা এবং খাদ্য উৎপাদনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব এখনও ২০২৪ সালের নজিরবিহীন তাপমাত্রার অভিঘাত সামলাতে ব্যস্ত। এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগের বার্তা দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করে বলেছে, এল নিনো নামের শক্তিশালী জলবায়ুগত ঘটনাটি আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। আর তার অর্থ, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, ঝড় এবং খাদ্য উৎপাদনে বিপর্যয়।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক মূল্যায়নে WMO জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের আগে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। নভেম্বরের মধ্যে সেই সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়াবে ৯০ শতাংশে।

সংস্থাটির মতে, অধিকাংশ আবহাওয়া মডেলই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রশান্ত মহাসাগরের জল ও বায়ুমণ্ডলে গড়ে ওঠা এই চক্রাকার আবহাওয়া-প্রক্রিয়াটি অন্তত মাঝারি মাত্রার হবে। কিছু মডেল আবার শক্তিশালী এল নিনোরও পূর্বাভাস দিচ্ছে।

তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এখনই এটিকে “এই শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো” বলতে রাজি নয়। কারণ এখনও পূর্বাভাসগুলির মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।

WMO-র মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো বলেন, “মডেলগুলির মধ্যে এখনও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কিছু মডেল শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে না, আবার কিছু মডেল সেই সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে।”

এল নিনো আসলে কী?

এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এটি দেখা যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এল নিনো আর শুধুমাত্র একটি স্বাভাবিক আবহাওয়া-চক্র নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এল নিনো যুক্ত হলে তার প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যখন ইতিমধ্যেই শিল্পযুগ-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, তখন এল নিনো সেই উষ্ণতাকে আরও উপরে ঠেলে দেয়। এই কারণেই ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো বিশ্বকে ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছরে পৌঁছে দিয়েছিল।

‘উষ্ণ পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি’

রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সতর্কবার্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিশ্বকে এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে।”

গুতেরেসের ভাষায়, “এল নিনো উষ্ণায়নের আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে। এর প্রভাব আরও তীব্র হবে, আরও দূর পর্যন্ত ছড়াবে এবং সীমান্ত পেরিয়ে বিধ্বংসী গতিতে আঘাত হানবে।”

রাষ্ট্রপুঞ্জের এই বক্তব্য কেবল আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগ নয়। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং মানবিক সংকটের সম্ভাবনাও।

কোথায় বৃষ্টি, কোথায় খরা?

প্রত্যেক এল নিনো এক নয়। তবুও কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনোর সময় সাধারণত— দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। অন্যদিকে মধ্য আমেরিকা, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতীয় মৌসুমি বৃষ্টির সঙ্গে এল নিনোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে বহুবার শক্তিশালী এল নিনো ভারতের বর্ষাকে দুর্বল করেছে, যার ফলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও প্রতিটি বছরের ফলাফল আলাদা হয়, তবু আবহাওয়াবিদরা ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

ঘূর্ণিঝড়ের চরিত্রও বদলে যায়

এল নিনো শুধু বৃষ্টি বা খরার বিষয় নয়। এটি সমুদ্রের ঝড়-ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। সাধারণত মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি ও সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন তৈরির পরিবেশ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়ের ঝুঁকির মানচিত্রও বদলে যেতে পারে।

২০২৪ সালের স্মৃতি এখনও তাজা

এল নিনোর ধ্বংসাত্মক প্রভাবের সাম্প্রতিক উদাহরণ খুব দূরে নয়। ২০২৪ সালে তানজানিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি, বন্যা এবং ভূমিধ্বসের পেছনে এল নিনোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। বহু অঞ্চলে কৃষি ও অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। একই সময়ে পৃথিবীর বহু দেশ রেকর্ড তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়েছিল।

২০২৪ সালকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরগুলির অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ইউরোপে আগাম সতর্কসংকেত?

এদিকে পশ্চিম ইউরোপও ইতিমধ্যে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার স্বাদ পেতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে মে মাসের তাপমাত্রার একাধিক রেকর্ড ভেঙে গেছে।

গত সপ্তাহে WMO এবং ব্রিটিশ আবহাওয়া দফতর মেট অফিস যৌথভাবে সতর্ক করে বলেছিল যে দশক শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবী নতুন তাপমাত্রা রেকর্ড গড়বে, এবং এল নিনো ফিরে এলে সেই ঘটনা ২০২৭ সালেই ঘটতে পারে। অর্থাৎ আগামী দুই বছর জলবায়ু ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।

খাদ্যসংকটের নতুন আশঙ্কা

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হল খাদ্য উৎপাদন।

ব্রিটেনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গ্যারেথ রেডমন্ড-কিং বলেছেন, এই পূর্বাভাস বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে সার সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে যদি এল নিনো খরা, অতিবৃষ্টি বা তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তাহলে খাদ্যশস্য উৎপাদন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং দরিদ্র দেশগুলিতে মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে।

শেষ কথা: সামনে আরও কঠিন সময়?

বিজ্ঞানীরা বারবার বলছেন, এল নিনো নিজে কোনও নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু একটি দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এর প্রত্যাবর্তন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি উদ্বেগের।

প্রশ্নটা শুধু আরেকটি আবহাওয়া-ঘটনা নয়। প্রশ্নটা হল, এমন এক পৃথিবীতে আমরা বাস করছি যেখানে প্রতিটি প্রাকৃতিক ওঠানামা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র, আরও ব্যয়বহুল এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। সেই কারণেই রাষ্ট্রসংঘের সতর্কবার্তাটি কেবল আবহাওয়াবিদদের জন্য নয়। এটি সরকার, কৃষক, ব্যবসা, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের জন্যও এক স্পষ্ট বার্তা—এল নিনো ফিরছে, এবং পৃথিবীকে তার জন্য এখনই প্রস্তুত হতে হবে।