অতিথি কলম

মলাটহীন মহাফেজখানা: কলেজ স্ট্রিট কি তবে এক অবাধ্য স্মৃতির অপরাধ?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • অয়ন মুখোপাধ্যায়: খুব সম্প্রতি কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের ওপর বইয়ের দোকানগুলোর উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু কথা বাতাসে ভাসছে।
  • বই বিক্রেতাদের একাংশ বলছে পুরনিগম থেকে নাকি মৌখিকভাবে জানিয়ে গেছে যে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের বইয়ের দোকান গুলো কে বন্ধ করতে হবে, বিশেষ করে ক্যালকাটা…
  • অফিশিয়ালি কোনো নোটিশ বা কাগজ কিন্তু এখনো কেউ দেখাতে পারেনি, কিন্তু সারা শহর জুড়ে যেভাবে হকার উচ্ছেদের কর্মযজ্ঞ চলছে, সেখানে দাঁড়িয়ে সমগ্র বই পাড়ার…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

অয়ন মুখোপাধ্যায়: খুব সম্প্রতি কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের ওপর বইয়ের দোকানগুলোর উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু কথা বাতাসে ভাসছে। বই বিক্রেতাদের একাংশ বলছে পুরনিগম থেকে নাকি মৌখিকভাবে জানিয়ে গেছে যে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের বইয়ের দোকান গুলো কে বন্ধ করতে হবে, বিশেষ করে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ফুটপাতের দিকটা ফাঁকা করতে হবে। অফিশিয়ালি কোনো নোটিশ বা কাগজ কিন্তু এখনো কেউ দেখাতে পারেনি, কিন্তু সারা শহর জুড়ে যেভাবে হকার উচ্ছেদের কর্মযজ্ঞ চলছে, সেখানে দাঁড়িয়ে সমগ্র বই পাড়ার আশঙ্কা ও শঙ্কা ঠিক এখানেই। প্রশ্ন, কেন কলেজ স্ট্রিট? কেন টার্গেট করা হলো এই বইপাড়াকেই?

এই প্রসঙ্গে বলা যায় সরকার যখন একটি শহরের জ্যামিতিক পক্ষাঘাত দূর করার প্রশাসনিক তাগিদ দেখিয়ে তার বৌদ্ধিক ফুসফুসটিকে উপড়ে ফেলতে চাইছে, তখন বুঝতে হবে সংকটটি শুধুমাত্র স্রেফ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার নয়; সংকটটি একমুখী উত্তর-আধুনিকতার আগ্রাসনের। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাত থেকে বইয়ের দোকান সরানোর সাম্প্রতিক ভাবনাটি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘মেকানিক্যাল মেমোরিসাইড’ বা স্মৃতিহত্যার প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা। যে প্রেসিডেন্সি বা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ঔপনিবেশিক স্থাপত্য ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে ডিকটেশন দিত, তার ঠিক উল্টোদিকের এই ফুটপাত গুলোতেই গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল, সাবঅল্টার্ন জ্ঞানবিশ্ব। আজ সেই অবাধ্য জ্ঞানবিশ্বকেই ‘নান্দনিক পরিচ্ছন্নতার’ নামে একরঙা করে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।

মেধার বিকেন্দ্রীকরণ বনাম নিও-লিবারেল এনক্লোজার

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ইউরোপের রেনেসাঁস বা উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমান্তরালে একটি ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা মুক্তাঙ্গন চিরকাল কাজ করেছিল। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাত হলো সেই ওপেন-এয়ার অ্যাকাডেমিয়া, যা পুঁজির একচেটিয়াকরণকে দেড়শো বছর ধরে চ্যালেঞ্জ করে আসছে এ যেনো এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিষ্ঠান। নামী কর্পোরেট বুকস্টোরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাচের খাঁচায় যে জ্ঞান কেবল উচ্চবিত্ত দের হাতের মুঠোয় ছিল বা যার দ্বারা এই উচ্চবিত্ত শ্রেণী শিক্ষা সংস্কৃতিতে একটা প্রিভিলেজ ক্লাসে পরিণত হয়েছিল বিশেষ করে ইন্টারনেট আসার আগে জ্ঞান যখন একটা শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত, তখন কলেজ স্ট্রিটের এই ফুটপাত বিশ টাকার লিটল ম্যাগাজিন বা কমদামী টেক্সট বই বা সেকেন্ড হ্যান্ড বই এনে করে তুলেছিল গণতান্ত্রিক। গরিব মেধাবী ছেলেমেয়েদের কাছে এই ফুটপাতের বই ছিল জ্ঞান চর্চার শেষ আশ্রয়স্থল। তাই আমার মনে হয় ফুটপাত সাফ করার এই নিও-লিবারেল নীতি আসলে ‘এনক্লোজার অ্যাক্ট’-এর আধুনিক রূপান্তর। জ্ঞানকে মুক্ত বাতাস থেকে তুলে এনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শো-রুমে পুনরায় বন্দি করা, যাতে মেধার ওপর কর্পোরেট চেইন শপগুলো আবার মনোপলি তৈরি করতে পারে। যে প্রশাসন উচ্ছেদের পরিকল্পনা করে বা উচ্ছেদের ভয় দেখায়, সবশেষে সেই প্রশাসন উচ্ছেদের নোটিশ দেয়। উচ্ছেদের দেবতারা আসলে স্থানিকতা বা ‘লোকালিটি’-র ধারণাকে মুছে দিয়ে গ্লোবাল ক্যাপিটালের উপযোগী এক নিস্পৃহ শূন্যতা (Non-place) তৈরি করতে চায়, যেখানে মানুষ কেবল পণ্য কিনবে, কিন্তু দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র বা সমাজ নিয়ে কোনো political manifesto বা রাজনৈতিক ইশতেহার খসড়া প্রকাশ করতে পারবে না।

প্রগতিশীলতার স্ববিরোধ: যখন আঁতুড়ঘরেই ক্যানিবালিজম

আমাদের সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডিটা লুকিয়ে আছে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণের ভেতর। যে রাজনৈতিক দর্শন বা শক্তি বাংলার মাটির গন্ধ, প্রান্তিক মানুষের অধিকার এবং সংস্কৃতির প্রগতিশীল ধারাকে পুঁজি করে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখে, তাদের জমানাতেই এই সাংস্কৃতিক কসাইখানাটি খোলে কীভাবে? সংস্কৃতির এই কর্পোরেট খোলনলচে বদল আসলে এক গভীর স্ব বিরোধিতা। তাই উন্নয়ন বা প্রগতির সংজ্ঞা যখন মানুষের মননশীলতার বিকাশকে বাদ দিয়ে স্রেফ ফ্লাইওভারের কংক্রিট আর রাস্তার চওড়া পরিমাপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সেই প্রগতি আসলে আত্ম বিস্মৃত। যে সরকার বিশ্বমঞ্চে বাংলার মনীষীদের ঐতিহ্যকে আইকন হিসেবে বিজ্ঞাপিত করে, আবার সেই সরকারই যখন প্রশাসনিক কলমের এক খোঁচায় কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের বইয়ের দোকান গুলো কে ‘অবৈধ জবর দখল’-এর তকমা দিয়ে দাগিয়ে দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে এক ধরণের political cannibalism বা নিজের আঁতুড়ঘরকে নিজেই গিলে খাওয়ার শামিল। মনে রাখবেন মুক্তচিন্তা কোনো চারদেয়ালের নিয়ন্ত্রিত সেমিনারে জন্মায় না, তা জন্মায় ফুটপাতের খোলামেলা পরিবেশে ভিন্নমতের পরিসরের ভেতর—প্রশাসন আজ সেই আদিম সামাজিক স্বতঃস্ফূর্ত নেটওয়ার্কটাই ভেঙে দিতে চাইছে।

বিকল্পের স্থাপত্য: ‘ক্রিয়েটিভ জোনিং’ বনাম আমলাতান্ত্রিক অন্ধত্ব

যাঁরা পথচারীর অধিকার আর যানচলাচলের নিখুঁত গাণিতিক যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁরা আধুনিক নগরবিজ্ঞান (Urban Planning) এবং ‘কালচারাল জিওগ্রাফি’ বা সাংস্কৃতিক ভূগোলের মৌলিক পাঠটিকে আসলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। স্থাপত্য কোনো মৃত পাথর নয়, স্থাপত্যের কাজ সংস্কৃতিকে ধারণ করা, তাকে বুলডোজার দিয়ে পিষে ফেলা নয়।

হেরিটেজ করিডোর ও পেডিস্ট্রিয়ান জোন

প্যারিসের সিন নদীর তীরের ‘বুকস্টল’ (The Bouquinistes) যদি ইউনেস্কোর কাছে হেরিটেজ তকমা পেয়ে পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ হতে পারে, তবে কলেজ স্ট্রিট কেন সেই হেরিটেজ তকমা পাবে না? মেডিকেল কলেজ থেকে সূর্য সেন স্ট্রিট পর্যন্ত অংশটিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ‘নো-কার জোন’ বা কেবল পথচারী ও বইপ্রেমীদের জন্য সংরক্ষিত ‘ওয়াকিং স্ট্রিট’ ঘোষণা করা কি খুব অসম্ভব?

আর্কিটেকচারাল কিয়স্ক

ফুটপাতের দোকানগুলোকে উচ্ছেদ না করে, তাদের স্থান সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে অভিন্ন হেরিটেজ লুকের কাঠের কিয়স্ক তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে। এতে রাস্তার নান্দনিকতাও বাঁচে, আবার এশিয়ার বৃহত্তম এই মুক্ত বইবাজারের অর্থনীতিও ধ্বংস হয় না। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন আমলা তান্ত্রিক জড়তার বাইরে গিয়ে সংস্কৃতির প্রতি এক ন্যূনতম বৌদ্ধিক দায়বদ্ধতা।

উপসংহার: এক মলাটহীন মরুভূমির দিকে

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই উচ্ছেদ বনাম প্রতিরোধ এর সংঘাতটি আসলে ‘অর্গানিক’ বনাম ‘মেকানিক্যাল’- দ্বন্দ্ব। আর সেইখানে দাঁড়িয়ে মনে রাখবেন কলেজ স্ট্রিট হলো একটি জীবন্ত, স্পন্দিত এবং অনিয়ন্ত্রিত সত্তা। যার কোনো সুনির্দিষ্ট বারকোড নেই, নেই কোনো আড্ডার টাইম-লিমিট। রাষ্ট্র আজ সেই জীবন্ত সত্তাটিকে মেরে ফেলে সেখানে এক যান্ত্রিক, নিষ্প্রাণ করিডোর বানাতে চাইছে। তাই শাসক যেনো মনে রাখে হ্যাঁ ঠিকই
ফুটপাত থেকে বইগুলো চলে গেলে রাস্তা হয়তো কিছুটা চওড়া হবে, কিন্তু বাঙালির মগজটা চিরকালের মতো সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। আর আমরা যারা এই শহরের সহ নাগরিক তারা যদি এই ফুটপাতের বইয়ের দোকানগুলোকে রক্ষা করতে না পারি, তবে এই কলকাতা আদতে এক মস্ত বড় মানসিক উপাসনালয় কে হারিয়ে ফেলবে আমরা হয় উঠব ছাদহীন, আশ্রয়হীন পরিণত হব মরুভূমিতে । সুতরাং এই যান্ত্রিক অন্ধকারের বিরুদ্ধে আজ স্রেফ আবেগের কান্নায় ভেঙে পড়া নয়, বরং রাষ্ট্রের এই ছদ্ম-আধুনিক মনস্তত্ত্ব কে তীব্র যুক্তির ডিকনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণ দিয়ে চূর্ণ করার বৌদ্ধিক লড়াই শুরু করতে হবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

সুমন চট্টোপাধ্যায়

<p data-path-to-node="3">সুমন চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৫৭) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং লেখক, যিনি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও অনন্য রচনাশৈলীর জন্য সুপরিচিত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="239">আজকাল</i> পত্রিকায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ বছর <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="337">আনন্দবাজার পত্রিকা</i>-র কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সাহসিকতার সাথে কভার করার পাশাপাশি স্টার আনন্দ, কলকাতা টিভি ও তারা বাংলার মতো টেলিভিশন মাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব সংবাদপত্র <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="664">একদিন</i> চালু করেন এবং ২০১২ সালে 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া' গ্রুপের বাংলা দৈনিক <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="738">এই সময়</i>-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ 'বাংলাস্ফিয়ার' (Banglasphere)-এ নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ লেখা ও মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="950">মাই ডেট উইথ হিস্ট্রি</i>, <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="972">প্রথম নাগরিক</i>, <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="986">সেদিনের সপ্তারোহী</i> ও <i data-path-to-node="0" data-index-in-node="1006">গুমঘর গুলজার</i>-এর মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।</p>

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles