Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়া আবারও এমন এক মুহূর্তের সাক্ষী হলো, যখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা হঠাৎ করেই কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে কিছুটা প্রশমিত হয়ে গেল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করে ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আসন্ন বড় সংঘর্ষ ঠেকিয়েছেন। তাঁর কথায়, “ইজরায়েল তাদের আক্রমণ করবে না, এবং তারাও ইজরায়েলকে আক্রমণ করবে না।”
এই ঘোষণার আগে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বেইরুতের দক্ষিণ উপশহরে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
বেইরুতের দিকে এগোচ্ছিল যুদ্ধ
ইজরায়েলি সেনাবাহিনী শুধু বিমান হামলার প্রস্তুতিই নিচ্ছিল না; বেইরুতের দিকে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযানের জন্য সেনা মোতায়েনও করা হচ্ছিল বলে জানা যায়। দক্ষিণ লেবানন থেকে শুরু করে রাজধানীর উপকণ্ঠ পর্যন্ত উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল।
এই পরিস্থিতির পেছনে ছিল সপ্তাহান্তে হিজবুল্লাহর ব্যাপক রকেট ও ড্রোন হামলা। সংগঠনটি ইজরায়েলের দিকে ৩০০-রও বেশি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করে। যদিও ইজরায়েলের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলার বড় অংশ প্রতিহত করে, তবু ঘটনাটি ইজরায়েলি নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট বার্তা ছিল যে উত্তর সীমান্ত এখনো অত্যন্ত অস্থির।
নেতানিয়াহু সরকারের অভ্যন্তরে প্রতিশোধমূলক কঠোর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হয়ে উঠছিল। বিশেষত সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ইরান, হিজবুল্লাহ এবং ইজরায়েলের মধ্যে যে সংঘর্ষের চক্র তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে বেইরুতের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান অনেকের কাছেই সময়ের অপেক্ষা বলে মনে হচ্ছিল।
ট্রাম্পের ‘ফোন কূটনীতি’
এই সংকটময় মুহূর্তে ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহু এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই আলোচনার ফলেই ইজরায়েল বেইরুতমুখী সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসতে সম্মত হয়েছে।
ট্রাম্পের এই ভূমিকা কেবল একটি যুদ্ধ এড়ানোর প্রচেষ্টা নয়; এটি তাঁর বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতিরও প্রতিফলন। তিনি বারবার দাবি করেছেন যে শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি বহু আন্তর্জাতিক সংকট প্রশমিত করতে সক্ষম।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, সংঘর্ষের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে গেলে এই ধরনের সমঝোতা খুবই ভঙ্গুর হতে পারে। একটি ফোনালাপ হয়তো কয়েক দিনের জন্য উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।
ইরানের ছায়া সর্বত্র
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান। হিজবুল্লাহ বহু বছর ধরেই তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র। ফলে লেবাননের সীমান্তে যা ঘটে, তা প্রায়শই বৃহত্তর ইরান–ইজরায়েল দ্বন্দ্বের অংশ হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর রকেট হামলাকে অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর কৌশলগত চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ইজরায়েলের পক্ষেও বেইরুতের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি ইরানের প্রতি একটি বার্তা পাঠানোর উপায়।
শান্তি, না কি সাময়িক বিরতি?
ট্রাম্পের ঘোষণার ফলে আপাতত যুদ্ধের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলে, এই অঞ্চলে “যুদ্ধবিরতি” এবং “স্থায়ী শান্তি” এক জিনিস নয়।
হিজবুল্লাহ এখনও সশস্ত্র, ইজরায়েল এখনও উচ্চ সতর্কতায়, এবং ইরান–ইজরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনও অমীমাংসিত। ফলে বেইরুতের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন হয়তো সাময়িকভাবে থেমেছে, কিন্তু সংকটের মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
বরং এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, মধ্যপ্রাচ্যে আজও একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি রকেট হামলা বা একটি বিমান আক্রমণ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো অঞ্চলকে বৃহত্তর যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। আপাতত যুদ্ধ থেমেছে; কিন্তু শান্তি এখনও অনেক দূরের পথ।