হাইলাইটস:

  • ৪৯ বছর বয়সে প্রয়াত ভারতীয় শুটিং কিংবদন্তি জসপাল রানা
  • মিউনিখ বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন
  • এশিয়ান গেমস ও কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের অন্যতম সফল শুটার ছিলেন
  • অলিম্পিক পদকজয়ী মনু ভাকর-সহ বহু তারকার মেন্টর
  • প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর মৃত্যুকে ভারতীয় ক্রীড়াজগতের “অপূরণীয় ক্ষতি” বলে উল্লেখ করেছেন

বাংলাস্ফিয়ার: শুক্রবার এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হলো ভারতীয় ক্রীড়ামহল। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শুটার এবং কিংবদন্তি কোচ জসপাল রানা। কয়েক দশক ধরে ভারতীয় শুটিংকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। একজন শুটার হিসেবে তিনি যেমন দেশের গর্ব ছিলেন, তেমনি কোচ হিসেবে তৈরি করেছেন নতুন প্রজন্মের বহু চ্যাম্পিয়ন।

খবর অনুযায়ী, মিউনিখে অনুষ্ঠিত আইএসএসএফ বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরার সময় বিমানে অসুস্থ হয়ে পড়েন রানা। দিল্লিতে অবতরণের পর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা স্টেন্ট বসানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি। হৃদ্‌যন্ত্রজনিত জটিলতাই তাঁর মৃত্যুর কারণ বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।

জসপাল রানার জীবন ছিল ভারতীয় শুটিংয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীতে জন্ম নেওয়া রানা অল্প বয়সেই শুটিং জগতে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর সাফল্য ভারতীয় শুটিংয়ের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েও সেবার তিনি বিশ্বসেরার মঞ্চে সোনা জিতেছিলেন। সেই জেদ, সেই মানসিক দৃঢ়তাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।

এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস এবং আন্তর্জাতিক শুটিং প্রতিযোগিতায় তাঁর পদকের তালিকা দীর্ঘ। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে ভারতের সবচেয়ে সফল অ্যাথলিটদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৫টি পদক, যার মধ্যে ৯টি স্বর্ণপদক, তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জুন পুরস্কার ও পদ্মশ্রী সম্মান লাভ করেন।

তবে অনেকের মতে, কোচ হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংস হয়তো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় শুটিংয়ের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অনন্য স্থপতি। বিশেষ করে অলিম্পিক পদকজয়ী মনু ভাকরের সাফল্যের পেছনে তাঁর ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। শুধু মনু নন, অসংখ্য তরুণ শুটার তাঁর প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

রানার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা ক্রীড়া দুনিয়ায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, জসপাল রানার প্রয়াণ ভারতীয় ক্রীড়াজগতের জন্য এক গভীর ক্ষতি। তিনি দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। একইভাবে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নঅভিনব বিন্দ্রা-সহ বহু ক্রীড়াবিদ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

জসপাল রানার জীবনকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হলে বলা যায়—‘নিখুঁত শট’-এর নিরন্তর অনুসন্ধান। শুটিং রেঞ্জে হোক বা প্রশিক্ষকের ভূমিকায়, তাঁর লক্ষ্য ছিল উৎকর্ষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাফল্য কেবল প্রতিভা দিয়ে আসে না; আসে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় এবং অবিরাম আত্মসংশোধনের মাধ্যমে।

বিধাতার নির্মম পরিহাস, ৫০তম জন্মদিনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে থেমে গেল সেই জীবন। কিন্তু লক্ষ্যভেদের যে সংস্কৃতি তিনি ভারতীয় শুটিংয়ে গড়ে দিয়ে গেলেন, তা বহু বছর ধরে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে বেঁচে থাকবে।

একজন চ্যাম্পিয়ন চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য শুটার, তাঁর জেতা পদক, তাঁর শেখানো দর্শন এবং তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে চিরকাল অমলিন থাকবে।