হাইলাইটস

  • সাংবাদিক, চিন্তক, কলামনিস্ট এবং রাজনীতিক—চারটি পরিচয়কে এক জীবনে ধারণ করেছেন স্বপন দাশগুপ্ত ।
  • ভারতীয় দক্ষিণপন্থার বৌদ্ধিক মুখগুলির মধ্যে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।
  • দীর্ঘদিন মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে বিজেপি রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন।
  • তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা দেখায়, ধারণার রাজনীতি এবং দলীয় রাজনীতির মধ্যে দূরত্ব কখনও কখনও খুবই সামান্য।
  • সমর্থকদের কাছে তিনি এক নির্ভীক মতাদর্শিক যোদ্ধা, সমালোচকদের কাছে ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যাওয়া এক বুদ্ধিজীবী।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের জীবনকে কেবল একটি পেশা বা একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। স্বপন দাশগুপ্ত সেই বিরল গোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তাঁকে শুধু সাংবাদিক বললে ভুল হবে, শুধু রাজনৈতিক ভাষ্যকার বললেও কম বলা হবে, আবার কেবল বিজেপি নেতা বললেও তাঁর চরিত্রের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। তিনি মূলত একজন রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী—যিনি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতা, টেলিভিশনের বিতর্কমঞ্চ এবং সংসদের করিডর—তিনটিকেই সমান দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন।

ভারতীয় রাজনীতিতে অনেক সাংবাদিক রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই সংবাদজগতের পরিচিতিকে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছেন। স্বপন দাশগুপ্তের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। তিনি প্রথমে মতাদর্শ নির্মাণ করেছেন, তারপর সেই মতাদর্শের রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজেছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা কোনও আকস্মিক মোড় নয়; বরং দীর্ঘ বৌদ্ধিক বিবর্তনের একটি স্বাভাবিক পরিণতি।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী পরিবেশে বেড়ে ওঠা স্বপন দাশগুপ্তের জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। ষাট ও সত্তরের দশকের পশ্চিমবঙ্গ ছিল বামপন্থী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি। বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা—সবখানেই বামপন্থী প্রভাব ছিল প্রবল। সেই পরিবেশেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি যে পথ বেছে নেবেন, তা সেই সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজের মূলধারার পথ ছিল না।

সাংবাদিক হিসেবে তাঁর খ্যাতির সূত্রপাত মূলত রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। তিনি কখনও ঘটনাকে কেবল ঘটনা হিসেবে দেখেননি। প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকা ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ইতিহাসের ব্যবহার। তিনি বর্তমান রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করতে অতীতের নানা ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানতেন। ফলে তাঁর লেখা সাধারণ রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ের বাইরে গিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রবন্ধে পরিণত হতো।

ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে নব্বইয়ের দশক ছিল উদারীকরণ, জোটরাজনীতি এবং হিন্দুত্ব রাজনীতির উত্থানের যুগ। এই সময়েই স্বপন দাশগুপ্ত ধীরে ধীরে নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ কলামনিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের রাজনীতিতে একটি নতুন সামাজিক শক্তির উত্থান ঘটছে। বহু সাংবাদিক যেখানে বিজেপিকে সাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা বলে মনে করতেন, সেখানে তিনি এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন।

এই কারণেই তাঁর লেখার মধ্যে বিজেপি এবং বৃহত্তর হিন্দুত্ব আন্দোলনের প্রতি এক ধরনের বৌদ্ধিক সহানুভূতি দেখা যায়। তিনি কখনও নিজেকে নিরপেক্ষতার কৃত্রিম মুখোশে ঢাকেননি। বরং স্পষ্ট মতাদর্শিক অবস্থান নিয়েই বিতর্কে অংশ নিয়েছেন।

তাঁর সমালোচকেরা বলেন, এখানেই সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্তের সীমাবদ্ধতা। তাঁদের মতে, একজন সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্পের বৌদ্ধিক মুখপাত্র হয়ে ওঠা নয়। কিন্তু সমর্থকেরা পাল্টা যুক্তি দেন, সাংবাদিকেরও রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে এবং সেই বিশ্বাস গোপন করার মধ্যে কোনও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

স্বপন দাশগুপ্তের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝার জন্য তাঁকে কেবল বিজেপির সমর্থক হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি আসলে সেই বৃহত্তর বৌদ্ধিক আন্দোলনের অংশ, যা ভারতের রাজনৈতিক ভাষাকে বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় জনপরিসরে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং নেহরুবাদ ছিল প্রধান আদর্শিক কাঠামো। স্বপন দাশগুপ্ত সেই কাঠামোর অন্যতম ধারাবাহিক সমালোচক।

তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে জাতীয় পরিচয়, সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ। তিনি মনে করেন স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি দেশের ঐতিহ্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সাংস্কৃতিক অনুভূতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। এই যুক্তিই পরবর্তীকালে বিজেপির রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালে Narendra Modi-র উত্থানের পর স্বপন দাশগুপ্তের রাজনৈতিক প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ মোদী যুগে বিজেপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, একটি বৃহত্তর আদর্শিক প্রকল্প হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রকল্পের জন্য রাজনৈতিক কর্মীর পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীরও প্রয়োজন ছিল। স্বপন দাশগুপ্ত সেই প্রয়োজন পূরণকারী অন্যতম মুখ।

রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য হওয়া তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই মুহূর্তে অনেকেই বলেছিলেন, সাংবাদিকতা থেকে রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেল। তবে বাস্তবে তিনি অনেক আগেই রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। রাজ্যসভা কেবল সেই বাস্তবতাকে সাংবিধানিক রূপ দেয়।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক সম্ভবত এই প্রশ্ন—তিনি কি সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছেন, নাকি সাংবাদিকতা করতেই করতেই রাজনীতিতে পৌঁছেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ তাঁর লেখালেখি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কখনও স্পষ্ট বিভাজনরেখা ছিল না।

তবু এটাও সত্য যে স্বপন দাশগুপ্তের মতো ব্যক্তিত্বরা গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা কেবল নির্বাচনী রাজনীতি করেন না; ধারণার জন্যও লড়াই করেন। তাঁদের উপস্থিতি রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। সমর্থন কিংবা বিরোধিতা—দুই ক্ষেত্রেই তাঁরা আলোচনা সৃষ্টি করেন।

আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে স্বপন দাশগুপ্ত এক অদ্ভুত সেতুবন্ধন। একদিকে তিনি কলকাতার পুরনো বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতির সন্তান, অন্যদিকে নতুন ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক জাগরণের অন্যতম মুখ। তিনি একই সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতার মানুষ এবং রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তা।

সম্ভবত এই দ্বৈত পরিচয়ই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ তিনি জানেন কীভাবে ধারণাকে ভাষায় রূপ দিতে হয়, আর ভাষাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হয়।

ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস যখন একদিন মোদী যুগের বৌদ্ধিক স্থপতিদের তালিকা তৈরি করবে, তখন স্বপন দাশগুপ্তের নাম নিঃসন্দেহে সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পাবে। তিনি হয়তো জননেতা নন, ভোট-টানার ক্ষমতাও তাঁর নেই। কিন্তু ধারণার জগতে প্রভাব বিস্তারের জন্য সবসময় ভোটের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও একটি কলমই যথেষ্ট। আর সেই কলমকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর করার বিরল ক্ষমতা স্বপন দাশগুপ্তের ছিল, এখনও আছে।