Home খবর ত্রাণের ত্রিপল থেকে তোলাবাজির খাতা: এক বিচিত্র চোর-ডাকাতের দল

ত্রাণের ত্রিপল থেকে তোলাবাজির খাতা: এক বিচিত্র চোর-ডাকাতের দল

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 2 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার:

হাইলাইটস

  • গ্রেফতার হওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাত ধরনের হলেও মূল সূত্র মাত্র তিনটি—অর্থ, ভয় ও পৃষ্ঠপোষকতা।
  • ত্রাণসামগ্রী মজুতের অভিযোগ শুধুমাত্র দুর্নীতির নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।
  • তোলাবাজি, কাটমানি ও স্থানীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগগুলি দেখায় যে দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
  • প্রশ্ন শুধু কে গ্রেফতার হলেন তা নয়; প্রশ্ন হল কেন তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন যে কখনও ধরা পড়বেন না।

(লেখাটি তিন কিস্তিতে প্রকাশিত হবে। আজ প্রথম কিস্তি)

 

ক্ষমতার পতনের শব্দ

রাজনীতির ইতিহাসে একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে। কোনও দল ক্ষমতায় থাকাকালীন তাকে বোঝা কঠিন। তার সভা হয়, মিছিল হয়, জয়ধ্বনি ওঠে, নেতারা বক্তৃতা দেন, কর্মীরা স্লোগান তোলেন। বাইরে থেকে সবকিছুই সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী বলে মনে হয়।

কিন্তু ক্ষমতা যখন দুর্বল হতে শুরু করে, তখন হঠাৎ করেই অন্য এক দৃশ্য সামনে আসে। দেওয়ালের রং খসে পড়ে, ভিতরের ইট দেখা যায়। দীর্ঘদিন চাপা থাকা অভিযোগ, গুজব, অসন্তোষ এবং অপরাধ একে একে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক গ্রেফতারির ঢেউকে সেই আলোতেই দেখা প্রয়োজন।

একজন নেতা ত্রাণসামগ্রী মজুতের অভিযোগে গ্রেফতার। অন্যজন তোলাবাজির মামলায়। কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র মজুতের অভিযোগ। কেউ ধরা পড়ছেন সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে। কোথাও রাজনৈতিক সন্ত্রাস, কোথাও খুনের মামলা, কোথাও আবার নারী নির্যাতনের অভিযোগ।

প্রশ্ন হল, এই ঘটনাগুলি কি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন? নাকি এগুলি একসঙ্গে মিলিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ছবির অংশ?

সাতটি অভিযোগ, একটি চরিত্র

গ্রেফতার হওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায়, সেগুলিকে মোটামুটি সাতটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।

  • ত্রাণসামগ্রী মজুত।
  • তোলাবাজি ও কাটমানি।
  • সরকারি অর্থ আত্মসাৎ।
  • রাজনৈতিক সন্ত্রাস।
  • অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত।
  • নারী নির্যাতন।
  • খুন বা খুনের চেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধ।

প্রথম দর্শনে এগুলি আলাদা আলাদা অপরাধ বলে মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই দেখা যায়, সবকটির ভিতরে একটি সাধারণ সূত্র কাজ করছে। ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করার প্রবণতা।এই প্রবণতাই সম্ভবত তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

ত্রাণসামগ্রী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই ভাবতে পারেন, কয়েকশো ত্রিপল বা কিছু কম্বল উদ্ধার হওয়া আর এমন কী বড় ঘটনা? আসলে ঘটনাটি ত্রিপল বা কম্বলের নয়। ঘটনাটি মানসিকতার।

যখন কোনও রাজনৈতিক নেতা সরকারি ত্রাণসামগ্রী নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তখন তিনি শুধু জিনিসপত্র জমাচ্ছেন না। তিনি রাজনৈতিক প্রভাবও জমাচ্ছেন। আজ বন্যা হলে তিনি দেবেন। আগামীকাল ঝড় হলে তিনি দেবেন। পরশু ভোট এলে তিনিই সাহায্য করবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের জায়গায় নিজেকে বসানোর চেষ্টা করবেন। এটাই আসল সমস্যা।

গণতন্ত্রে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে সেই সম্পর্কের মাঝখানে একটি নতুন স্তর তৈরি হয়েছিল—স্থানীয় রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর স্তর। রেশন চাই? নেতার কাছে যান। ত্রাণ চাই? নেতার কাছে যান। রাস্তা চাই?নেতার কাছে যান। চাকরির সুপারিশ চাই? নেতার কাছে যান।

এই ব্যবস্থায় নাগরিক ধীরে ধীরে অধিকারভোগী থেকে অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে ওঠেন। আর নেতা হয়ে ওঠেন স্থানীয় শাসক।

তোলাবাজি: একটি সমান্তরাল করব্যবস্থা

তোলাবাজির অভিযোগগুলিকে অনেকেই সাধারণ অপরাধ বলে মনে করেন।কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর তাৎপর্য অনেক গভীর। রাষ্ট্র কর নেয় আইন অনুযায়ী। তোলাবাজি কর নেয় ক্ষমতা অনুযায়ী। এই দুইয়ের পার্থক্যটাই গণতন্ত্র ও দলতন্ত্রের পার্থক্য।

যখন কোনও নির্মাণকাজ শুরু করতে হলে কাউন্সিলরের অনুমতি প্রয়োজন হয়, যখন ব্যবসা চালাতে হলে স্থানীয় নেতার আশীর্বাদ লাগে, তখন বাস্তবে একটি সমান্তরাল প্রশাসন তৈরি হয়। সেই প্রশাসনের কোনো সংবিধান নেই। কোনো আইন নেই। কোনো জবাবদিহি নেই। আছে শুধু ক্ষমতা। এবং ক্ষমতার উৎস হল রাজনৈতিক পরিচয়।

এই কারণেই তোলাবাজির অভিযোগগুলি শুধুমাত্র ফৌজদারি মামলা নয়। এগুলি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ।

রাজনৈতিক দল থেকে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক

তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় রূপান্তর সম্ভবত এখানেই ঘটেছিল।

২০১১ সালে যে দলটি ক্ষমতায় এসেছিল, তার মূল শক্তি ছিল জনআন্দোলন। সিঙ্গুর।

নন্দীগ্রাম। কৃষিজমি আন্দোলন। শাসকবিরোধী জনরোষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের দলটি প্রশাসনের দলে পরিণত হয়।আর প্রশাসনের দলটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ক্ষমতার নেটওয়ার্ক। সেখানে আদর্শের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণ। রাজনীতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যবস্থাপনা। বক্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সংগ্রাহক। কর্মীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মধ্যস্থতাকারী।এই পরিবর্তন খুব ধীরে ধীরে ঘটে।

প্রথমে কেউ টের পায় না। কিন্তু একসময় দেখা যায়, সংগঠনের ভিতরে সবচেয়ে দ্রুত উপরে উঠছেন তাঁরা, যাঁরা ভোট নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, টাকা তুলতে পারেন এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।সেই মুহূর্ত থেকেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে শুরু করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

আজ এত গ্রেফতারির পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটা নয় যে কে ধরা পড়লেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—

কেন তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন যে কখনও ধরা পড়বেন না?

কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘ ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব। কেউ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে যান না। কেউ হঠাৎ করে মনে করেন না যে সরকারি ত্রাণ তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কেউ একদিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেন না যে প্রশাসনের চেয়েও তাঁর ক্ষমতা বেশি। এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে জন্মায়। বছরের পর বছর ধরে। এবং সেই বিশ্বাস জন্মায় তখনই, যখন রাজনৈতিক সংগঠন ও রাষ্ট্রের সীমারেখা ক্রমশ মুছে যেতে থাকে।

দ্বিতীয় কিস্তিতে: কীভাবে একটি প্রতিবাদের দল ধীরে ধীরে ক্ষমতার দলে পরিণত হয়, এবং কেন দীর্ঘ ক্ষমতা প্রায় সব রাজনৈতিক দলকেই একই ফাঁদের দিকে ঠেলে দেয়

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles