Home খবর যড়যন্ত্রের তত্ত্ব কেন এত জনপ্রিয়

যড়যন্ত্রের তত্ত্ব কেন এত জনপ্রিয়

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 3 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: সোনারপুরের ঘটনা নিয়ে অভিষেক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের বয়ান সম্পূর্ণ মিথ‍্যে ইতিমধ‍্যেই প্রমাণিত। অকুস্থলে বাসিন্দারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এক বাক‍্যে বলেছেন সেখানে একজন বহিরাগতও ছিলনা, এটি ছিল স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

তবুএই ধরনের বয়ান বারবার জন্ম নেয় কেন?

উত্তরটা খুব কঠিন নয়।কারণ বাস্তবতা সাধারণত বিরক্তিকর। কিন্তু ষড়যন্ত্র সবসময় উত্তেজনাপূর্ণ। একজন নেতা কোনও এলাকায় গিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়লেন—এটা সংবাদ। কিন্তু একজন নেতা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন—এটা মহাকাব্য।রাজনীতিবিদরা সংবাদে বাঁচেন না। তাঁরা মহাকাব্যে বাঁচেন।

একবার ভাবুন।ধরা যাক সত্যিই একটি বিরাট হত্যার চক্রান্ত হয়েছিল। তাহলে পরিকল্পনাকারীরা কারা? তাঁদের বুদ্ধিমত্তার মান কেমন? কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম হত্যাচক্রান্তই এত অদ্ভুতভাবে পরিচালিত হয়েছে। সাধারণত ষড়যন্ত্রকারীরা গোপনীয়তা বজায় রাখেন। এখানে দেখা যাচ্ছে তাঁরা শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্য রাস্তায় নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গোপন অভিযান পরিচালনার জন্য এর চেয়ে খারাপ পদ্ধতি বোধহয় মানবসভ্যতা এখনও আবিষ্কার করতে পারেনি।

যদি সত্যিই কেউ এমন পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে তাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারী নয়, বরং অপেশাদার নাট্যকার বলা উচিত।অবশ্য রাজনৈতিক অভিধানে “হত্যার চেষ্টা” শব্দটির একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। এটি এমন একটি অলৌকিক শব্দবন্ধ, যা ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, মানুষ রেগে গেল কেন? উত্তর: হত্যার চেষ্টা। কেউ যদি বলেন, স্থানীয় অসন্তোষ ছিল না? উত্তর: হত্যার চেষ্টা। কেউ যদি জানতে চান, আপনার সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে কি? উত্তর: হত্যার চেষ্টা। এই শব্দবন্ধটি একধরনের রাজনৈতিক কীটনাশক। সমস্ত অস্বস্তিকর প্রশ্নকে মেরে ফেলে।

আসলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বৈশিষ্ট্য হল, ভোটারদের কোনও কৃতজ্ঞতাবোধ নেই। তারা পাঁচ বছর আগে হাততালি দিয়েছে বলে আজও দেবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। তারা একসময় সমর্থন করেছে বলে চিরকাল সমর্থন করবে, এমন কোনও চুক্তিপত্রও নেই।রা জনীতিবিদরা প্রায়ই এই বিষয়টি ভুলে যান। তাঁরা ভাবেন জনপ্রিয়তা একবার অর্জন করলে তা স্থায়ী সম্পত্তিতে পরিণত হয়।কিন্তু জনপ্রিয়তা জমিজমা নয়। এটি ভাড়াবাড়ি। প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হয়।  না দিলে মালিক অন্য ভাড়াটে খুঁজে নেন।

সোনারপুরের ঘটনায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হল স্থানীয় মানুষের ভূমিকাকে প্রায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করার চেষ্টা। এ যেন বলা হচ্ছে, এলাকার মানুষের নিজস্ব কোনও মতামত থাকতে পারে না। তারা নিজেরা প্রতিবাদ করতে পারে না। তারা নিজেরা অসন্তুষ্ট হতে পারে না।কেউ যদি প্রতিবাদ করে, তাহলে নিশ্চয়ই তাকে কোথাও থেকে পাঠানো হয়েছে।

এই যুক্তির শেষ পরিণতি অত্যন্ত মজার। কারণ তাহলে কোনও রাজনৈতিক দলেরই কখনও জনসমর্থন কমে না। শুধু বহিরাগত বেড়ে যায়। রাজনীতির ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ আছে। যখন মানুষ সমর্থন করে, তখন বলা হয় জনগণের রায়। যখন মানুষ বিরোধিতা করে, তখন বলা হয় অপপ্রচার। যখন মানুষ প্রশংসা করে, তখন বলা হয় গণতন্ত্র। যখন মানুষ প্রশ্ন করে, তখন বলা হয় ষড়যন্ত্র। এই মানসিকতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এটি ধীরে ধীরে বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

একসময় নেতা শুধু নিজের কথাই শুনতে পান।তারপর নিজের লোকদের কথা। তারপর জরিপ সংস্থার কথা। তারপর সামাজিক মাধ্যমের অনুগামীদের কথা। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কথা আর শোনাই যায় না।এখানেই সোনারপুরের ঘটনার আসল তাৎপর্য।

বিক্ষোভটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটির ব্যাখ্যা।কারণ ব্যাখ্যাটি আমাদের জানায় ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে। যদি কিছু মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, তাহলে কি তাদের কথা শোনা হবে? নাকি তাদের বহিরাগত ঘোষণা করা হবে? যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, তাহলে কি উত্তর দেওয়া হবে? নাকি তাকে ষড়যন্ত্রকারী বলা হবে? এই প্রশ্নগুলিই আসল।

আর একটি বিষয় খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। যদি সত্যিই এত ভয়াবহ হামলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে একজন নেতা বারবার জনসমাবেশে যাচ্ছেন কেন? যদি প্রতিটি রাস্তার মোড়ে হত্যাচক্রান্ত লুকিয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক কর্মসূচি তো কার্যত অসম্ভব হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায়, পরদিনই আবার সভা হচ্ছে। আবার মিছিল হচ্ছে। আবার জনসংযোগ হচ্ছে। অর্থাৎ বিপদ এতটাই ভয়ঙ্কর যে বক্তৃতায় তার বর্ণনা দিতে হয়, কিন্তু বাস্তবে এতটাই সীমিত যে রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করতে হয় না। এই বৈপরীত্যটি সত্যিই শিক্ষণীয়।

সবচেয়ে বড় কথা, গণতন্ত্রে প্রতিবাদ কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। অস্বাভাবিক হল এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিবাদকে সবসময় অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ হাততালি দিলে সেটা স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু মানুষ রেগে গেলে সেটা নাকি পরিচালিত। মানুষ ফুল দিলে সেটা ভালোবাসা। কিন্তু মানুষ প্রশ্ন করলে সেটা ষড়যন্ত্র। এই দ্বৈত মানদণ্ড দীর্ঘদিন টিকে না। কারণ বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত নিজের রাস্তা খুঁজে নেয়।

সোনারপুরের ঘটনাকে তাই দুইভাবে দেখা যায়। একটি ব্যাখ্যা বলছে, এটি ছিল সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চক্রান্ত, বহিরাগতদের অপারেশন এবং সম্ভাব্য হত্যার পরিকল্পনা। অন্য ব্যাখ্যা বলছে, কিছু মানুষ তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, এবং সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের কাহিনি নির্মাণ করা হয়েছে। কোন ব্যাখ্যা বেশি বিশ্বাসযোগ্য, তার বিচার পাঠকই করবেন।

তবে ইতিহাসের একটি শিক্ষা মনে রাখা ভাল। যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিটি সমালোচককে ষড়যন্ত্রকারী মনে করতে শুরু করে, তারা ধীরে ধীরে সমালোচকদের নয়, বাস্তবতাকেই হারিয়ে ফেলে। আর বাস্তবতার বিরুদ্ধে কোনও রাজনৈতিক দলের আজ পর্যন্ত জয়লাভের রেকর্ড নেই। বহিরাগতদের বিরুদ্ধে জেতা যায়।বিরোধীদের বিরুদ্ধেও জেতা যায়। কিন্তু বাস্তবতার বিরুদ্ধে নয়।

সোনারপুরের প্রকৃত রহস্য সম্ভবত সেখানেই।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles