Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের গ্রীষ্ম যেন আর ঋতু নয়, এক দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগ। দিল্লির পিচগলা রাস্তা থেকে শুরু করে বিদর্ভের শুকিয়ে যাওয়া কুয়ো, কলকাতার ভ্যাপসা রাত থেকে রাজস্থানের মরুভূমির উত্তপ্ত হাওয়া— গোটা উপমহাদেশ যেন ধীরে ধীরে এমন এক আবহাওয়ার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে “স্বাভাবিক” শব্দটির অর্থই পাল্টে যাচ্ছে (India climate change crisis)। রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু প্রধান Simon Stiell এবার সেই বাস্তবতাকেই আরও নগ্ন ভাষায় সামনে আনলেন। তাঁর কথায়, ভারতের চলমান তাপপ্রবাহ (India heatwave 2026) কোনও বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল, যার মূল চালিকাশক্তি কয়লা, তেল এবং গ্যাসের নির্বিচার ব্যবহার।
আগুনে পুড়ছে ভারত
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে (Extreme summer in India)। ভারতের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। দিনের গরমের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠছে রাতের উষ্ণতা। অনেক শহরে রাতের তাপমাত্রাও ৩০ ডিগ্রির নিচে নামছে না (Warm night conditions north India)। ফলে শরীর বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
এই গরম কেবল অস্বস্তির বিষয় নয়। এটি শ্রম, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। রাস্তার নির্মাণকর্মী, ডেলিভারি কর্মী, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক— যাঁদের কাজ খোলা আকাশের নিচে, তাঁদের জন্য প্রতিটি দুপুর এখন একেকটি যুদ্ধ (Heat stroke cases India)।
রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু প্রধান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন সেই মানুষদের কথা, যাঁদের ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র তো দূরের কথা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎও নেই। ভারতের কোটি কোটি মানুষ এমন ঘিঞ্জি ঘরে বাস করেন, যেখানে টিনের ছাদ দুপুরের রোদে চুল্লির মতো গরম হয়ে ওঠে। শহরের বস্তি এলাকায় তাপমাত্রা অনেক সময় আশপাশের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি বেশি থাকে— যাকে বিজ্ঞানীরা “আরবান হিট আইল্যান্ড” (urban heat island) বলেন।
বিদ্যুতের চাহিদা ভাঙছে রেকর্ড
এই গরমের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। ২১ মে ভারতের পিক পাওয়ার ডিমান্ড ২৭০.৮ গিগাওয়াটে পৌঁছয়। প্রতিটি পরিবারে ফ্যান, কুলার, এসি একসঙ্গে চলতে শুরু করায় গ্রিডের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে— সৌরশক্তির ভূমিকা। দুপুরের প্রচণ্ড রোদ এখন শুধু দুর্ভোগের প্রতীক নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও প্রধান উৎস হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ না বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
ভারত সরকার বহুদিন ধরেই এক অদ্ভুত দ্বৈত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কয়লাভিত্তিক অর্থনীতি; অন্যদিকে একইসঙ্গে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল সৌরশক্তি বাজারগুলির একটি। এই দ্বন্দ্বই এখন ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন: ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের সংকট
দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এটি ভবিষ্যতের সমস্যা— ২০৫০ বা ২১০০ সালের বিপদ। কিন্তু ভারতের বর্তমান গ্রীষ্ম সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে “এক্সট্রিম হিট ইভেন্ট” আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হবে।
ভারতের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটছে। গত এক দশকে তাপপ্রবাহের সময়কাল ও তীব্রতা দুটোই বেড়েছে। শহরগুলো কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় প্রাকৃতিক শীতলীকরণ কমেছে। গাছপালা কাটা, জলাভূমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
একসময় গরম মানেই ছিল ঋতুচক্রের অংশ। এখন গরম মানে স্বাস্থ্য সংকট। হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন ও শ্বাসকষ্টের রোগী বাড়ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ বুঝতেই পারেন না যে শরীর ধীরে ধীরে অতিরিক্ত তাপের কাছে হার মানছে।
সবচেয়ে বড় আঘাত গরিবদের ওপর
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম দিক হল এর অসমতা। যে মানুষ সবচেয়ে কম দূষণ ঘটায়, তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগে। দিল্লির কোনও কর্পোরেট অফিসে বসা কর্মী হয়তো সারাদিন এসির মধ্যে কাটাচ্ছেন। কিন্তু একই শহরের নির্মাণশ্রমিক দুপুরের রোদে কাজ করতে বাধ্য।
ভারতের বিপুল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে “গরমের ছুটি” বলে কিছু নেই। কাজ বন্ধ মানে আয় বন্ধ। ফলে মানুষ জানে বিপদ আছে, তবুও রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়।
গ্রামের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। তাপপ্রবাহের সঙ্গে জলের সংকট যুক্ত হওয়ায় কৃষিকাজ বিপর্যস্ত হচ্ছে। ফসলের উৎপাদন কমছে, গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, কুয়ো শুকিয়ে যাচ্ছে। বহু এলাকায় পানীয় জল সংগ্রহ করাই দৈনন্দিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
অভিযোজন না করলে বিপদ আরও বাড়বে
সাইমন স্টিয়েল স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধু কার্বন নিঃসরণ কমালেই হবে না; এখনই অভিযোজন বা adaptation-এ জোর দিতে হবে। অর্থাৎ শহর ও গ্রামকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ এই নতুন আবহাওয়ার বাস্তবতায় টিকে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি—
- শহরে সবুজ অঞ্চল বৃদ্ধি
- জলাভূমি ও পুকুর সংরক্ষণ
- শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক হিট-সেফটি নীতি
- তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
- কম খরচের কুলিং সেন্টার
- সৌরশক্তি ও বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্প্রসারণ
অনেক শহর ইতিমধ্যে “হিট অ্যাকশন প্ল্যান” চালু করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলির প্রয়োগ এখনও অসম ও সীমিত।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ— পুরনো বিতর্কের নতুন রূপ
ভারতের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন— দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নাকি পরিবেশগত স্থিতি? বহু বছর ধরে যুক্তি ছিল, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভারতের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দারিদ্র্য দূর করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জলবায়ু বিপর্যয় নিজেই দারিদ্র্য ও বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।
একদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্প ও নগরজীবন চালানো কঠিন। অন্যদিকে সেই কয়লাই ভবিষ্যতের আরও ভয়াবহ গরমের ভিত্তি তৈরি করছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর “পরিবেশ বনাম উন্নয়ন” নয়; বরং “কী ধরনের উন্নয়ন”।
এক নতুন ভারতের সতর্কসংকেত
ভারতের এই গরম আসলে একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলির একটি যখন এমন তাপচাপে কাঁপছে, তখন বোঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তন আর কোনও বিমূর্ত আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়। এটি মানুষের শরীর, শ্রম, খাদ্য, ঘুম ও বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
সম্ভবত আগামী দশকে ভারতকে সবচেয়ে বেশি বদলে দেবে নির্বাচন নয়, প্রযুক্তি নয়, বরং আবহাওয়া। আর সেই ভবিষ্যৎ কতটা সহনীয় হবে, তা নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর।0……………………………………………………………