Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা হাইকোর্ট মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানতে চান, কোনও রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যদি বিরোধী দলনেতার জন্য একটি নাম প্রস্তাব করে, তাহলে স্পিকার কি সেই নাম উপেক্ষা করে অন্য কাউকে ওই পদে নিয়োগ করতে পারেন? একই সঙ্গে জানতে চাওয়া হয়, ৭০ জন বিধায়কের সমর্থিত প্রস্তাব পাওয়ার পর স্পিকার কেন নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছিলেন।
এই প্রশ্ন ওঠে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের করা মামলার শুনানিতে। মামলায় বিধানসভার স্পিকারের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, যেখানে বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অনুগত শিবিরের দাবি, দলের আনুষ্ঠানিক মনোনীত প্রার্থী ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।
বিচারপতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
শুনানির শুরুতেই স্পিকারের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেলকে বিচারপতি জিজ্ঞাসা করেন, যে দিন বিরোধী দলনেতার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেদিন বিধানসভায় কতগুলি রাজনৈতিক দল ছিল।
উত্তরে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল জানান, বর্তমানে যতগুলি দল রয়েছে, তখনও ততগুলিই ছিল। এরপর বিচারপতি মন্তব্য করেন—
“তাহলে যে নামটি প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পক্ষ থেকেই এসেছিল। সেক্ষেত্রে আমি প্রশ্ন তুলছি— সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রস্তাবিত নামকে কি স্পিকার উপেক্ষা করতে পারেন এবং অন্য কাউকে নিয়োগ করতে পারেন?”
স্পিকারের পক্ষে কী যুক্তি?
স্পিকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল যুক্তি দেন যে প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি আলাদা এবং স্পিকারকে দলের গঠন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি জানান, শিবসেনা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসরণ করেই স্পিকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, এই মামলায় ৬ মে এবং ১৯ মে— দুটি পৃথক প্রস্তাব ছিল। অভিযোগ, ১৯ মে বিধায়কদের দিয়ে ৬ মে-র তারিখযুক্ত প্রস্তাবে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল।
অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বলেন—
“ওরা বলছে ৬ মে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু পরে নিজেরাই স্বীকার করেছে যে ১৯ মে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। ৬ মে কোনও প্রস্তাব ছিল না। এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত।”
তিনি আরও দাবি করেন, জমা পড়া স্বাক্ষরগুলির অনেকই ব্লক লেটারে লেখা ছিল এবং সেগুলি বিধানসভার সরকারি নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে মেলেনি।
আদালতের পাল্টা প্রশ্ন
এই যুক্তি শুনে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন—
“তা ঠিক আছে। কিন্তু যখন প্রস্তাবটি আপনার কাছে এল, তখন তো কোনও আপত্তি ছিল না। ৭০ জন বিরোধী বিধায়ক একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। স্পিকারের কাজ ছিল সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভবিষ্যতে যদি কোনও অভিযোগ আসে, তখন তদন্ত করতে পারতেন। কিন্তু শুরুতেই কেন নিজে তদন্তে নামলেন?”
পরে বিচারপতি আরও বলেন—
“বিতর্ক তো ২৭ মে-র পরে তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার আগে স্পিকার কেন নীরব ছিলেন? যিনি বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিয়োগ পেলেন, তাঁকে কে প্রস্তাব করেছিল? সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো এখনও তৃণমূলের সঙ্গেই রয়েছে।”
৫৮ বনাম ৭৮ বিধায়কের প্রশ্ন
অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতকে জানান, ২০ মে অভিযোগ জমা পড়ে এবং ২৭ মে একটি এফআইআর দায়ের হওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। সেই সময়ে স্পিকারের কাছে তৃণমূলের ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনপত্রও পৌঁছেছিল।
কিন্তু বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন—
“মাত্র দু’জন বিধায়কের অভিযোগে কীভাবে ৭০ জনের সমর্থন ৫৮-এ নেমে গেল? যদি মাত্র দু’জন অভিযোগ করেন, তাহলে স্পিকারের কর্তব্য কী? আমি বুঝতে পারছি না। ৫৮ জনের ব্যাপারে স্পিকার এত উৎসাহী, অথচ ৭৮ জন বিধায়কের প্রস্তাব এলে তিনি তদন্ত শুরু করলেন কেন?”
দুই প্রস্তাবের মধ্যে সিদ্ধান্ত কীভাবে?
আদালত আরও জানতে চায়, একই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যদি দুটি ভিন্ন প্রস্তাব আসে, তাহলে স্পিকার কীভাবে কোনও একটিকে গ্রহণ করবেন?
বিচারপতির প্রশ্ন— “তিনি কি নিজে থেকেই একটি প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দিতে পারেন? প্রথম প্রস্তাবটি কেন বাতিল করা হল, তার কোনও লিখিত আদেশ কোথায়?”
অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল জানান, পশ্চিমবঙ্গের সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী স্পিকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
তবে বিচারপতি আবার প্রশ্ন করেন— “যখন দুটি প্রস্তাব রয়েছে, তখন হাউসকে না ডেকে স্পিকার কীভাবে ঠিক করবেন কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল?”
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য
আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতের কাছে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের আবেদন করেন। তিনি বলেন, বিধানসভা ১৮ জুন থেকে বসতে চলেছে, ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাঁর দাবি, বর্তমানে লোকসভাতেও বিদ্রোহী সাংসদদের একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে এবং তারা স্পিকারের কাছে আলাদা ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছে।
তিনি যুক্তি দেন, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, কেবলমাত্র বিধায়ক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তাঁর কথায়— “রাজনৈতিক দল এবং বিধায়ক দল এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকেই স্পিকারকে মানতে হবে।”
মামলার পটভূমি
আগের শুনানিতে আদালত ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছিল, দল থেকে বহিষ্কৃত একজন বিধায়ককে কীভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। আবেদনকারীদের দাবি, ৬ মে নির্বাচিত তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্ত স্পিকারকে জানানোও হয়।
তাদের অভিযোগ, পরে ৫৯ জন বিধায়কের সমর্থন দেখিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রার্থী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা দশম তফসিল তথা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের মূল চেতনাকেই আঘাত করে।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি কৃষ্ণ রাও মামলার পরবর্তী শুনানি বুধবার দুপুর ২টায় ধার্য করেছেন। এই মামলার রায় পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।