বড় খবর

আলোয় বদলাল মস্তিষ্ক

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের পথ দেখিয়ে ২০২৬ সালের শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী—কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান এবং গেয়র্গ নাগেল।
  • সোমবার, ৫ অক্টোবর, সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল পরিষদ তাঁদের নাম ঘোষণা করে।
  • আলোকসংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল এবং অপ্টোজেনেটিক্স নিয়ে তাঁদের গবেষণা স্নায়ুবিজ্ঞানে খুলে দিয়েছে নতুন দরজা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের পথ দেখিয়ে ২০২৬ সালের শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী—কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান এবং গেয়র্গ নাগেল। সোমবার, ৫ অক্টোবর, সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল পরিষদ তাঁদের নাম ঘোষণা করে। আলোকসংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল এবং অপ্টোজেনেটিক্স নিয়ে তাঁদের গবেষণা স্নায়ুবিজ্ঞানে খুলে দিয়েছে নতুন দরজা। শুধু মস্তিষ্কের কোন অংশ কখন সক্রিয় হচ্ছে তা দেখা নয়, নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণ করে তার ভূমিকা পরীক্ষা করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ডাইসেরথ যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও জৈবপ্রকৌশলের অধ্যাপক। হেগেমান জার্মানির বার্লিনের হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং নাগেল ভুর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তাঁদের গবেষণার পথ শুরু হয়েছিল আলাদা জায়গা থেকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিলেছে একই জায়গায়—আলোকে ব্যবহার করে জীবন্ত কোষের আচরণ বদলানো।

শুরুটা হয়েছিল এককোষী শৈবাল দিয়ে। শেষ পর্যন্ত সেই গবেষণাই পৌঁছেছে মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতি, আবেগ ও আচরণের মতো জটিল বিষয় বোঝার কাজে।

বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যাক একটি উদাহরণে। কোনও প্রাণী ভয় পেলে তার মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় হচ্ছে—এমনটা দেখা গেলেই কি বলা যায়, ওই অংশটিই ভয় তৈরি করছে? নাও হতে পারে। সেটি হয়তো ভয়ের ফলেও সক্রিয় হয়েছে। এখানেই অপ্টোজেনেটিক্সের বিশেষত্ব। নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে গবেষকেরা দেখতে পারেন, সেই কোষের কাজ বদলালে প্রাণীর আচরণও বদলায় কি না। অর্থাৎ শুধু সহাবস্থান নয়, সম্ভাব্য কারণ-ফল সম্পর্কও পরীক্ষা করা যায়।

এই পথের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার চ্যানেলরোডপসিন। ক্ল্যামাইডোমোনাস নামের এককোষী শৈবাল কীভাবে আলোর দিকে সাঁতার কাটে, তা জানতে গিয়ে পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল এই আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন শনাক্ত করেন। নীল আলো পড়লে প্রোটিনটির মধ্যে একটি চ্যানেল খুলে যায়। সেই পথ দিয়ে আয়ন কোষে ঢুকতে পারে এবং কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থায় পরিবর্তন ঘটায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল পরের পর্যবেক্ষণ। এই প্রোটিন অন্য ধরনের কোষে বসালেও সেই কোষ আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। স্নায়ুকোষের কার্যকলাপও বৈদ্যুতিক সংকেতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে প্রশ্ন উঠল—শৈবালের এই প্রোটিনকে কাজে লাগিয়ে কি স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্নায়ুকোষকেও আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

ডাইসেরথ ও তাঁর সহকর্মীরা সেই প্রশ্নের পরীক্ষামূলক উত্তর খুঁজলেন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় তাঁদের দল দেখায়, চ্যানেলরোডপসিনের জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে আলো ব্যবহার করে সেই কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব মিলিসেকেন্ডের নির্ভুলতায়—অর্থাৎ এক সেকেন্ডকে এক হাজার ভাগ করলে তার এক ভাগ সময়ের মাত্রায়। স্নায়ুকোষের দ্রুত সংকেত আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে এই গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই গবেষণার সহলেখকদের মধ্যে এডওয়ার্ড বয়ডেন, ফেং ঝাং এবং আর্নস্ট বামবার্গও ছিলেন। ফলে তিন নোবেলজয়ীর স্বীকৃতির পিছনে রয়েছে বহু গবেষকের দীর্ঘ সহযোগিতামূলক কাজের ইতিহাস।

এই প্রযুক্তির নাম অপ্টোজেনেটিক্স—‘অপ্টো’, অর্থাৎ আলো, আর ‘জেনেটিক্স’, অর্থাৎ জিনপ্রযুক্তির সমন্বয়। প্রথমে নির্দিষ্ট কোষকে আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরপর উপযুক্ত আলো সেই কোষে পৌঁছে তার কার্যকলাপ বদলে দেওয়া হয়। পরবর্তী গবেষণায় শুধু স্নায়ুকোষ সক্রিয় করার নয়, তার কার্যকলাপ দমন করার উপায়ও তৈরি হয়েছে।

ফলে গবেষকদের হাতে তৈরি হয়েছে অনেক বেশি নির্ভুল পরীক্ষার সুযোগ। কোনও স্নায়ুপথ সক্রিয় করলে কী হয়, আবার সেটিই নিষ্ক্রিয় করলে কী বদলায়—দুই দিক থেকেই পরীক্ষা করা সম্ভব। মস্তিষ্কের জটিল সার্কিট কীভাবে আচরণ তৈরি করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডাইসেরথের গবেষণায় ইঁদুরের পার্কিনসনসের উপসর্গ, সামাজিক আচরণ এবং বিষণ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত আচরণ নিয়েও অপ্টোজেনেটিক্স ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের জটিল আবেগকে কোনও একটি স্নায়ুকোষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বরং নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের ভূমিকা আলাদা করে পরীক্ষা করার ক্ষমতাই এই প্রযুক্তির বড় শক্তি।

মস্তিষ্কের রোগ বোঝার ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। কোনও উপসর্গের পিছনে নির্দিষ্ট কোষ বা স্নায়ুসংযোগের ভূমিকা জানা গেলে ভবিষ্যতে আরও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার পথ খুলতে পারে। তবে প্রাণীর মডেলে পাওয়া ফল সরাসরি মানুষের চিকিৎসায় প্রয়োগ করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অপ্টোজেনেটিক্স এখনও মূলত শক্তিশালী গবেষণার হাতিয়ার; মানুষের চিকিৎসায় এর ব্যবহার নিয়ে আলাদা করে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই প্রয়োজন।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির চিকিৎসাগত সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণায়। ২০২১ সালে ‘নেচার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায় আক্রান্ত এক রোগীর আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসার কথা জানানো হয়। জিনপ্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর চোখের নির্দিষ্ট কোষকে আলোকসংবেদনশীল করা হয়েছিল। পরে বিশেষ চশমার মাধ্যমে রেটিনায় আলোর সংকেত পাঠানো হয়। সেই ব্যবস্থায় রোগী বস্তুর উপস্থিতি, অবস্থান ও সংখ্যা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।

তবে সাফল্যের সীমাও ছিল স্পষ্ট। স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি এবং বিশেষ চশমা ছাড়া ওই রোগী বস্তু শনাক্ত করতে পারেননি। তাই এটিকে সব ধরনের অন্ধত্বের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা বলা যাবে না। তবু পরীক্ষাটি দেখিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত দৃষ্টিব্যবস্থার অবশিষ্ট কোষকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এখানেই এবারের নোবেলের তাৎপর্য। শৈবাল কেন আলোর দিকে সাঁতার কাটে—এই কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া গবেষণার সঙ্গে শুরুতে মানুষের মস্তিষ্কের চিকিৎসার কোনও সরাসরি যোগ ছিল না। কিন্তু মৌলিক বিজ্ঞানের সেই অনুসন্ধানই ধীরে ধীরে তৈরি করেছে স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণ করার নতুন প্রযুক্তি।

তিন বিজ্ঞানীর কাজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। মস্তিষ্কের কোন কোষ কখন সক্রিয় হচ্ছে, শুধু তার মানচিত্র তৈরিই নয়—এবার সেই কোষকে নির্দিষ্টভাবে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে ফলাফলও পরীক্ষা করা যায়। স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের জটিল সম্পর্ক বোঝার পথে এটি তাই বড় এক ধাপ।

ক্ষুদ্র এক শৈবালের আলো-চেনার ক্ষমতা থেকে মস্তিষ্কের রহস্যের খোঁজ—বিজ্ঞানের সেই দীর্ঘ যাত্রাকেই সম্মান জানাল ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles