স্বাস্থ্য

ওজন কমানোর ‘গডজিলা’!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • রেটাট্রুটাইডে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত ওজন কমার ইঙ্গিত, কমতে পারে রক্তে শর্করা ও প্রদাহও ওজন কমানোর ওষুধের দুনিয়ায় রেটাট্রুটাইডকে বলা হচ্ছে ‘গডজিলা’।
  • কারণ, নতুন এক বড় পরীক্ষায় এই ওষুধে কারও কারও শরীরের ওজন এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কমার ইঙ্গিত মিলেছে।
  • শুধু ওজন নয়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার কয়েকটি ঝুঁকির সূচকেও উন্নতি দেখা গিয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

রেটাট্রুটাইডে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত ওজন কমার ইঙ্গিত, কমতে পারে রক্তে শর্করা ও প্রদাহও

ওজন কমানোর ওষুধের দুনিয়ায় রেটাট্রুটাইডকে বলা হচ্ছে ‘গডজিলা’। কারণ, নতুন এক বড় পরীক্ষায় এই ওষুধে কারও কারও শরীরের ওজন এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কমার ইঙ্গিত মিলেছে। শুধু ওজন নয়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার কয়েকটি ঝুঁকির সূচকেও উন্নতি দেখা গিয়েছে। কমেছে শরীরে প্রদাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও।

রেটাট্রুটাইডের বিশেষত্ব তার কাজের পদ্ধতিতে। এটি একই সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন—জিএলপি-১, জিআইপি এবং গ্লুকাগনের কার্যকলাপ অনুকরণ করে। এই হরমোনগুলি ক্ষুধা, রক্তে শর্করা এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

ওজন কমানোর বহুল ব্যবহৃত ওষুধ ওয়েগোভি মূলত জিএলপি-১ ব্যবস্থায় কাজ করে ক্ষুধা কমায়। মাউঞ্জারো জিএলপি-১ ও জিআইপি—দুই হরমোনের রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে। রেটাট্রুটাইড সেখানে আরও এক ধাপ এগিয়ে গ্লুকাগন রিসেপ্টরও সক্রিয় করে। এর ফলে শরীরে শক্তি খরচ বাড়তে পারে।

তবে আপাতত রেটাট্রুটাইড কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পায়নি। স্থূলতা ও টাইপ ২ ডায়াবিটিস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার ফল অবশ্য ওষুধটির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে।

গবেষকদের বক্তব্য, রেটাট্রুটাইড শরীরের ওজন উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়েছে। পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়া সংক্রান্ত ঝুঁকির সূচকগুলিতেও উন্নতি দেখা গিয়েছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন মোটের উপর জিএলপি-১ রিসেপ্টর সক্রিয়কারী অন্য ওষুধগুলির মতোই।

গবেষণাটির অর্থায়ন করেছে রেটাট্রুটাইডের প্রস্তুতকারক এলাই লিলি। ফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা দ্য ল্যানসেট-এ। ইতালির মিলানে ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব ডায়াবিটিসের বার্ষিক সম্মেলনেও ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে।

কতটা কমল ওজন?

৮০ সপ্তাহের তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় অংশ নেন ২,০৪৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক। আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, মেক্সিকো, রোমানিয়া, স্পেন এবং আমেরিকা—এই আটটি দেশ থেকে তাঁদের নেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকের বিএমআই ছিল ২৭ বা তার বেশি এবং টাইপ ২ ডায়াবিটিস ছিল। অংশগ্রহণকারীদের ৪৮ শতাংশ মহিলা এবং ৫২ শতাংশ পুরুষ। গড় বয়স ৫৫ বছর।

অংশগ্রহণকারীদের দৈবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়। কে রেটাট্রুটাইড পাচ্ছেন আর কে সক্রিয় উপাদানবিহীন প্লাসিবো পাচ্ছেন, তা অংশগ্রহণকারী বা গবেষক—কেউই জানতেন না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘র‌্যান্ডমাইজড, ডাবল-ব্লাইন্ড, প্লাসিবো-কন্ট্রোলড’ পরীক্ষা।

চারটি দলে ভাগ করে দেওয়া হয় প্রতি সপ্তাহে ইনজেকশন। ২৮৯ জন পান প্লাসিবো। ২৯২ জন পান ৪ মিলিগ্রাম রেটাট্রুটাইড, ২৮৪ জন ৯ মিলিগ্রাম এবং ২৮৭ জন ১২ মিলিগ্রাম। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তা নিয়ে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

৮০ সপ্তাহ পরে দেখা যায়, ৪ মিলিগ্রাম রেটাট্রুটাইড পাওয়া ব্যক্তিদের শরীরের ওজন গড়ে ১১.৯ শতাংশ কমেছে। ৯ মিলিগ্রামের ক্ষেত্রে কমেছে ১৬.৮ শতাংশ এবং ১২ মিলিগ্রামের ক্ষেত্রে ১৮.৮ শতাংশ। প্লাসিবো পাওয়া ব্যক্তিদের ওজন কমেছে গড়ে ৫.১ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি মাত্রার ওষুধ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেক—৪৭ শতাংশ—শুরুর ওজনের অন্তত ২০ শতাংশ কমাতে পেরেছেন। ৩১ শতাংশ কমিয়েছেন অন্তত ২৫ শতাংশ ওজন। প্লাসিবোর ক্ষেত্রে এই হার ছিল যথাক্রমে ৬ শতাংশ ও ৩ শতাংশ।

শুধু ওজন নয়

রেটাট্রুটাইডের প্রভাব শুধু ওজনের মাপে আটকে থাকেনি। ওষুধ পাওয়া ব্যক্তিদের ৭২ শতাংশের HbA1c-এর মাত্রা ৬.৫ শতাংশ বা তার নীচে নেমেছে। প্লাসিবোর দলে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ।

HbA1c পরীক্ষায় আগের দুই থেকে তিন মাসে রক্তে শর্করার গড় মাত্রার ধারণা পাওয়া যায়। টাইপ ২ ডায়াবিটিস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ৬.৫ শতাংশ একটি স্বীকৃত সীমামান।

গবেষকদের মতে, রেটাট্রুটাইড পাওয়া ব্যক্তিদের রক্তচাপ এবং রক্তের বিভিন্ন ধরনের চর্বি বা লিপিড প্রোফাইলেও উন্নতি দেখা গিয়েছে। পাশাপাশি কমেছে হাই-সেনসিটিভিটি সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন বা hsCRP—শরীরে প্রদাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে

তবে ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে পরিপাকতন্ত্র সংক্রান্ত সমস্যা।

রেটাট্রুটাইডের বিভিন্ন মাত্রা পাওয়া ব্যক্তিদের ২৭ থেকে ৩৪ শতাংশের ডায়রিয়া হয়েছে। প্লাসিবোর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১৩ শতাংশ। বমি বমি ভাব হয়েছে রেটাট্রুটাইড পাওয়া ১৪ থেকে ২৮ শতাংশের। প্লাসিবোর ক্ষেত্রে এই হার ৮ শতাংশ।

পরীক্ষা চলাকালীন সাত জন অংশগ্রহণকারীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু’জন ছিলেন ৪ মিলিগ্রামের দলে, তিন জন ৯ মিলিগ্রামের দলে, এক জন ১২ মিলিগ্রামের দলে এবং এক জন প্লাসিবো পেয়েছিলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মৃত্যুগুলির সঙ্গে পরীক্ষাধীন চিকিৎসার সম্পর্ক ছিল না।

গর্ভাবস্থা নিয়েও প্রশ্ন

মিলানের সম্মেলনে রেটাট্রুটাইডের পাশাপাশি ওজন কমানোর ওষুধ নিয়ে আরও একটি গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। টাইপ ২ ডায়াবিটিস রয়েছে এমন মহিলাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে গর্ভাবস্থার প্রতিকূল ফলাফলের সরাসরি সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়নি। ফল প্রকাশিত হয়েছে দ্য ল্যানসেট অবস্টেট্রিক্স, গাইনিকোলজি অ্যান্ড উইমেন’স হেলথ-এ।

তবে এখানেই গবেষকদের সতর্কবার্তা। এই বিষয়ে এখনও যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ফলে আরও গবেষণা জরুরি।

বিশেষ করে সন্তানধারণের বয়সে থাকা মহিলাদের মধ্যে এই ধরনের ওষুধের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গবেষকদের মতে, ব্যবহারের এই বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওষুধগুলির নিরাপত্তা ও প্রভাব নিয়ে গবেষণাও দ্রুত বাড়াতে হবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles