বালেনের দুই মুখ

যা জানা জরুরি
- যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম সমাজমাধ্যমে দেওয়া বার্তা।
- অথচ ক্ষমতায় আসার মাত্র ছ’মাসের মধ্যে নেপালের ৩৬ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ—বালেন নামে যিনি বেশি পরিচিত—বিশ্বের রাজনীতিসচেতন তরুণদের কাছে হয়ে উঠেছেন এক পরিচিত…
- মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় বক্তৃতা করতে চলেছেন শাহ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গাঢ় রঙের রোদচশমায় চোখ আড়াল করে রাখেন। সংসদের অধিবেশনেও নিয়মিত দেখা যায় না তাঁকে। যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম সমাজমাধ্যমে দেওয়া বার্তা। অথচ ক্ষমতায় আসার মাত্র ছ’মাসের মধ্যে নেপালের ৩৬ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ—বালেন নামে যিনি বেশি পরিচিত—বিশ্বের রাজনীতিসচেতন তরুণদের কাছে হয়ে উঠেছেন এক পরিচিত মুখ।
মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় বক্তৃতা করতে চলেছেন শাহ। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে থাকবে এমন একটি দাবি, যা বিশ্বের বহু তরুণের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ।
বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায় তুলনামূলক ভাবে কম হলেও তার সবচেয়ে ভয়াবহ অভিঘাত সামলাতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের দেশগুলিকে। গত মাসেই নেপালে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যায় হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। কোনও কোনও বিজ্ঞানীর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ওই বিপর্যয়ের তীব্রতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। শাহের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবারের বক্তৃতায় বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন প্রধানমন্ত্রী।
শাহের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে যাচ্ছেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানালও। গত সপ্তাহে কাঠমান্ডুতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, শুধু নেপালের তরুণদের নয়, গোটা বিশ্বের তরুণদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারি আমরা।”
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন শাহ। কিন্তু পরিচয় শুধু ইঞ্জিনিয়ারেই আটকে নেই—তিনি কবি, র্যাপশিল্পীও। নির্বাচনী প্রচারের গান পর্যন্ত নিজেই লিখেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্ষমতায় পৌঁছে দিয়েছেন নেপালের সেই উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা, যাঁরা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
তাঁদের ক্ষোভ ছিল একদিকে দুর্নীতি ও ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পরিবারের বিরুদ্ধে, অন্য দিকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। রাজনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে প্রদর্শিত বিলাসবহুল জীবন তাঁদের ক্ষোভ আরও উসকে দিত। আর একই সময়ে জীবিকার সন্ধানে বহু নেপালিকে দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতে হচ্ছিল।
বালেনের র্যাপগানেও উঠে এসেছে সেই হতাশা। বিদেশি ব্যাঙ্ক, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং “লুটেরা নেতাদের” বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তিনি।
একটি গানে তাঁর কথাই ছিল, “কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নেই, তবু ভান করি না। আমাকে খাটো করা হয়, তবু কম লেখাপড়া জানা মানুষেরা আমায় বোঝেন।”
২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থানের পথ আরও প্রশস্ত হয়।
তার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার নেয়। নেপালের তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে কয়েক জন তরুণের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। মাত্র দু’দিনের মধ্যে পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতা হারায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে জেন জেড আন্দোলনের প্রতিধ্বনি শোনা গেলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই আন্দোলন রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে পারেনি।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বালেনের সমালোচকদের তালিকায় এখন নেপালের জেন জেড প্রজন্মের একাংশও রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন, তাঁর নিজের শাসনপদ্ধতিতেও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন শহর পরিচ্ছন্ন করার নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন শাহ। তবে সমালোচকদের দাবি, সেই অভিযানের চাপ পড়েছিল অসহায় ও প্রান্তিক বাসিন্দাদের উপরেও।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তিনি ঘনিষ্ঠ একটি ছোট বৃত্তের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তাঁর মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগে থেকে অবহিত থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
শাহের আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সুশীলা কার্কি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের উপর চাপ ও হুমকির আশঙ্কা করছেন।
প্রবীণ মানবাধিকার আইনজীবী ওমপ্রকাশ আরিয়াল বলেন, “প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর লোকজনের কারণে মানুষ এখন ভয়ের আবহে বাস করছেন।”
প্রকাশ্যে এমন সমালোচনা করতে রাজি মানুষের সংখ্যা অবশ্য কমে এসেছে বলে মনে করেন আরিয়াল। তিনি তাঁদেরই একজন, যাঁরা এখনও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন।
জেন জেড বিদ্রোহের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আরিয়াল। পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তাঁর হাতে। তারও আগে, শাহ যখন কাঠমান্ডুর মেয়র, তখন তাঁকে আইনি পরামর্শ দিতেন আরিয়াল।
এখন তাঁর মুখেই শোনা যাচ্ছে আরও এক কঠিন বাক্য—“আমরা এখন বালেনের শাসনে বাস করছি…”
বিশ্বমঞ্চে তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন যে নেতা, দেশের ভিতরে তাঁকেই ঘিরে উঠছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার প্রশ্ন। বালেনের রাজনৈতিক উত্থানের এই দ্বিমুখী ছবিই এখন নেপালের নতুন রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচ্য।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



