হাইলাইটস:
- মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির চুক্তির পরেও লেবাননে সেনা রাখার ঘোষণা ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর।
- ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার।
- নেতানিয়াহুর স্পষ্ট বার্তা, “সংগ্রাম শেষ হয়নি, দেশের নিরাপত্তার জন্য যতদিন দরকার আমরা থাকব।”
- এই অবস্থান মার্কিন-ইরান শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।
- যুদ্ধজয়ের দাবি করলেও ট্রাম্পের চুক্তি থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে সদ্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্যের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন সেই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সোমবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, লেবাননে মোতায়েন ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনও পরিকল্পনা তাঁর সরকারের নেই।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল দৃঢ় এবং অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জের সুরে ভরা। তিনি বলেন, “সংগ্রাম শেষ হয়নি।” তাঁর এই মন্তব্য শুধু ইরানের উদ্দেশেই নয়, বরং সেই মার্কিন-ইরান সমঝোতার প্রতিও ইঙ্গিত, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা হয়েছে।
চুক্তি নিয়ে এখনও বহু ধোঁয়াশা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ইরান আলোচনার সময় অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার দাবি করেছিল। কিন্তু সেই আলোচনায় ইজরায়েল সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যা সমঝোতা হয়েছে, তার সবকিছু মানতে ইজরায়েল বাধ্য নয়—এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন নেতানিয়াহু।
গত মার্চে মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ অভিযানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই লেবাননের শিয়া সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ইরানের সমর্থনে ইজরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া শুরু করে। তার জবাবে ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একটি তথাকথিত “নিরাপত্তা অঞ্চল” গড়ে তোলে এবং সেখানে সেনা মোতায়েন করে। শুধু সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, ইজরায়েল বারবার বৈরুত এবং তার আশপাশে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষে লেবাননে ৩,৭০০-রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে সেখানকার কর্তৃপক্ষের দাবি। অন্যদিকে ইজরায়েলে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যার বিচারে ক্ষয়ক্ষতির ভার অনেক বেশি বহন করেছে লেবানন, কিন্তু নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে ইজরায়েল এখনও পিছিয়ে আসতে নারাজ।
নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে বলেন, “আমরা নিরাপত্তা অঞ্চলে থাকব যতদিন দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজন।” এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। চলতি বছরের শেষেই ইজরায়েলে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুদ্ধ এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি ডানপন্থী ভোটব্যাঙ্ককে নিজের পাশে ধরে রাখতে চাইছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে ইজরায়েলের ভেতরেও ট্রাম্প-ইরান চুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে ইজরায়েলের কৌশলগত স্বার্থকে গৌণ করে তুলেছেন। আবার অন্য অংশের অভিযোগ, যুদ্ধের এত বড় মূল্য চুকিয়ে শেষ পর্যন্ত এমন একটি চুক্তি হয়েছে যা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রভাব পুরোপুরি থামাতে পারেনি।
এই সমালোচনার মুখে নেতানিয়াহু একদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়েছেন, অন্যদিকে নিজের স্বাধীন অবস্থানও তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, “এটি অংশীদারদের সম্পর্ক। অনেক বিষয়ে আমরা একমত হই, আবার কিছু বিষয়ে মতভেদও থাকে। সেরা পরিবারেও এমন হয়।”
তবে যুদ্ধের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনি আপসহীন। তাঁর দাবি, ইজরায়েল এবং আমেরিকা যদি পদক্ষেপ না নিত, তাহলে ইরান ইতিমধ্যেই পরমাণু অস্ত্রের মালিক হয়ে যেত এবং ইজরায়েল “গণবিধ্বংসী বিপদের” মুখে পড়ত। অর্থাৎ যুদ্ধকে তিনি সফল বলে তুলে ধরলেও যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি তাঁর উচ্ছ্বাস স্পষ্টতই সীমিত।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে করা তাঁর মন্তব্য। নেতানিয়াহু বলেন, “এই চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এটি তাঁর সিদ্ধান্ত।” একই কথা তিনি দু’বার পুনরাবৃত্তি করেন। তারপর যোগ করেন, “আমাদের নিজেদের স্বার্থ রয়েছে।”
এই বক্তব্যই সম্ভবত বর্তমান পরিস্থিতির সারাংশ। ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ, লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা-নীতির প্রশ্নে এখনও কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ যে এখনও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত, নেতানিয়াহুর বক্তব্য তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।