হাইলাইটস:
- বিশ্বকাপ চলাকালীন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বাভাবিক নীরবতা রাজনৈতিক কৌশল কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষক।
- অন্য সব বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক পোস্ট করলেও বিশ্বকাপ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য প্রায় নেই বললেই চলে।
- লেখকের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আসরে বিতর্ক এড়িয়ে চলাই হয়তো ট্রাম্পের পরিকল্পনা।
- ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ভ্লাদিমির পুতিনের সংযত উপস্থিতির সঙ্গে টানা হয়েছে তুলনা।
- বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযান বা রাজনৈতিক উত্তেজনাকেও দৃশ্যত আড়ালে রাখা হয়েছে।
২৮ জুন বিকেল ৪টা ৩৮ মিনিটে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট করেন। এতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ ট্রাম্পের পোস্টের বন্যা এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা।
সেদিনই তিনি বিকেল ৩টা ৫৮ মিনিটে, ৩টা ৫৯ মিনিটে এবং রাত ৭টা ৪২ মিনিটে পরপর আরও কয়েকটি পোস্ট করেছিলেন। সেই সব পোস্টে ছিল তাঁর চেনা ভঙ্গি—অতিরঞ্জিত আত্মপ্রশংসা, অভিযোগ আর বিদ্রূপ। যেন সত্তরের দশকের কোনো বিজ্ঞাপনের হাস্যকর চরিত্র হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে, অথচ ভাষা এমন, যেন নয় বছরের ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করছে।
সেদিনের পোস্টগুলিতে ছিল নতুন নাচঘর তৈরির আত্মপ্রচার, গলফ কোর্সের দুরবস্থা নিয়ে প্রায় ৬০০ শব্দের দীর্ঘ অভিযোগ এবং যৌন নিপীড়নের মামলায় আপিলে হেরে যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ। তাঁর মূল আপত্তি ছিল, আদালতে বিচারকদের সেই ভিডিও দেখতে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাঁকে নিজেকেই যৌন হয়রানির ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করতে দেখা যায়। মনে রাখা দরকার, এই মানুষটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
এই সব পোস্টের ভিড়ে বিকেল ৪টা ৩৮ মিনিটের পোস্টটি আলাদা করে নজর কেড়েছিল। প্রথমত, তার ভাষা ছিল তুলনামূলক সংযত। সেখানে সরাসরি কাউকে আক্রমণ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, সেটি ছিল ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে।
ট্রাম্প লিখেছিলেন, “ফিফার দর্শকসংখ্যা ইতিহাসের যে কোনও বিশ্বকাপের চেয়ে অনেক বেশি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক মহান শ্রদ্ধার নিদর্শন।”
তিনি মূলত বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে দর্শকসংখ্যার রেকর্ডের কথা উল্লেখ করছিলেন। আয়োজক তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার স্টেডিয়ামে ইতিমধ্যেই ৪৬ লক্ষ দর্শক উপস্থিত হয়েছেন, যা একই পর্যায়ে আগের সব বিশ্বকাপের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই পরিসংখ্যানকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ এবার বিশ্বকাপে দল বেশি, ম্যাচও অনেক বেশি। ইতিমধ্যেই কাতার বিশ্বকাপের মোট ম্যাচসংখ্যার চেয়েও বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে শুধু দর্শকসংখ্যা বেশি হওয়া মানেই এই বিশ্বকাপ আগেরগুলির চেয়ে ভালো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। লেখকের ভাষায়, এটি অনেকটা এমন যেন বলা হচ্ছে—আমাদের বিশাল আকারের পনির-ভর্তি বার্গারে ক্যালরি বেশি, তাই সেটাই নিশ্চয়ই সেরা।
কিন্তু আসল বিষয়টি অন্যত্র।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ২২ দিন এবং ৮২টি ম্যাচ পেরিয়ে গেলেও ট্রাম্প কার্যত অদৃশ্য। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যিনি বারবার আলোচনায় ছিলেন, সেই প্রেসিডেন্ট এখনও পর্যন্ত একটি ম্যাচও দেখতে যাননি। দর্শকসংখ্যা নিয়ে ওই একটিমাত্র সংক্ষিপ্ত পোস্ট ছাড়া বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁর আর কোনও উল্লেখযোগ্য মন্তব্যও নেই।
যে মানুষটি সব সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে ভালোবাসেন, তিনি হঠাৎ এত নীরব কেন?
লেখকের মতে, এটি নিছক কাকতালীয় নয়; বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল।
ট্রাম্পের পুরো রাজনৈতিক দর্শনই যেন এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন শব্দঝড় তৈরি করা। তিনি প্রতিটি বিষয় নিয়ে একই সঙ্গে কথা বলেন, বিতর্ক তৈরি করেন এবং সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে রাখেন। তাঁর এই লাগাতার উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতিই তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র।
এই প্রসঙ্গে লেখক একটি বৃহত্তর তুলনাও টেনেছেন।
একসময় বিশাল ভৌগোলিক বিস্তার, অসংখ্য গোষ্ঠী ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে চীনকে কার্যত শাসন করা কঠিন ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীভূত একদলীয় শাসন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় কণ্ঠস্বর গোটা দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বিশাল আকারই আজ চীনের শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক কণ্ঠস্বর মিলিয়ে এক ধরনের অবিরাম শব্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সবাই কথা বলছে, সবাই চিৎকার করছে। এই অবস্থা কখনও কখনও দেশটিকে আরও বিভক্ত করে তুলছে।
লেখকের মতে, ট্রাম্প এই বাস্তবতাকে খুব ভালো করেই বোঝেন। তাই তিনি জানেন, ধারাবাহিকভাবে একই স্বরে, একই ভঙ্গিতে, সব বিষয়ে কথা বলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠে পরিণত হন। মানুষ তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নয়, তাঁর উপস্থিতি এবং স্বরকেই চিনতে শেখে। এটাই তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের মূল শক্তি।
ঠিক এই কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আসর—ফুটবল বিশ্বকাপ—চলাকালীন তাঁর এই নীরবতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক মনে করেন, এর একটি ঐতিহাসিক নজিরও রয়েছে।
২০১৮ সালে রাশিয়ায় বিশ্বকাপের সময় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও খুব সীমিতভাবে সামনে এসেছিলেন। তিনি উদ্বোধন ও ফাইনালে উপস্থিত ছিলেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে তিনি প্রায় কোনও বিতর্কিত মন্তব্য করেননি।
সেই সময় রাশিয়া নিজেকে বিশ্বের সামনে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও অতিথিপরায়ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। প্রকাশ্যে ভিন্নমত দমন বা কঠোর রাষ্ট্রশক্তির প্রদর্শনও অনেকটাই আড়ালে রাখা হয়েছিল। এমনকি মস্কোর অপরাধচক্র এবং কুখ্যাত ফুটবল সমর্থকদেরও সংযত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে তখন নানা মহলে আলোচনা হয়।
একই ধরনের কৌশল এবারও দেখা যাচ্ছে বলে লেখকের ধারণা।
বিশ্বকাপ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের নানা শহরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা উৎসব করছেন। অথচ এই সময়ে তাঁদের ঘিরে কোনও বড় রাজনৈতিক উসকানি বা বিতর্কিত সরকারি বক্তব্য সামনে আসেনি।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আশঙ্কা ছিল, অভিবাসন দমন অভিযান নিয়ে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আয়োজক শহরগুলির আশপাশে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তৎপরতা প্রায় নেই বললেই চলে।
অন্য কোথাও অভিযান চললেও বিশ্বকাপের শহরগুলিতে সেটি যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই আড়ালে রাখা হয়েছে—অন্তত বিদেশ থেকে আসা সমর্থকদের কাছে এমনটাই মনে হচ্ছে।