ভুতনির জলে পাঁচ মন্ত্রী: ভাঙনের শিকড় গভীরে, তীর বাঁচিয়ে কী লাভ?

যা জানা জরুরি
- মালদহের ভুতনি ও রতুয়ার বন্যা–ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে ১৯ সেপ্টেম্বর নদীপথে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভার পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল।
- পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার, সেচ প্রতিমন্ত্রী জোয়েল মুর্মু, দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রী অজয় পোদ্দার প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে…
- দিনশেষে মানিকচক ব্লক কার্যালয়ে উদ্ধার, জল নিষ্কাশন ও পুনর্বাসন নিয়ে বৈঠক হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মালদহের ভুতনি ও রতুয়ার বন্যা–ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে ১৯ সেপ্টেম্বর নদীপথে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভার পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল। পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার, সেচ প্রতিমন্ত্রী জোয়েল মুর্মু, দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রী অজয় পোদ্দার প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে উত্তর চণ্ডীপুর, পশ্চিম রতনপুর, কালুটানটোলা, বসন্ততলা, মহানন্দাটোলা ও বিলাইমারির পরিস্থিতি দেখেন। দিনশেষে মানিকচক ব্লক কার্যালয়ে উদ্ধার, জল নিষ্কাশন ও পুনর্বাসন নিয়ে বৈঠক হয়েছে।
ভুতনি গঙ্গাবেষ্টিত দ্বীপাঞ্চল। নদীর জল বাড়া, বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ভাঙন এখানে একই সঙ্গে মানুষের ঘর, ফসল ও যোগাযোগ কেড়ে নেয়। চলতি বন্যায় একশোর বেশি নৌকা উদ্ধার ও ত্রাণে নামানো হয়েছে এবং অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর আগের সপ্তাহে নিশ্চিত হয়েছিল। পূর্ব বাসুদেবপুরের কাছে বাঁধ ভেঙে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। বর্তমান পরিদর্শনে মন্ত্রীরা ভুতনি সেতুর সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকক্ষ, সেনা ও পুলিশের প্রস্তুতি এবং নৌকায় ত্রাণ পৌঁছনোর ব্যবস্থা পরীক্ষা করেছেন।
মথুরাপুর মডেল স্কুলের ত্রাণশিবিরে রান্নাঘর, পানীয় জল ও স্বাস্থ্য পরিষেবাও দেখা হয়েছে। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বই এবং মহিলাদের স্যানিটারি প্যাড দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু কত পরিবার এখনও জলবন্দি, কত বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট, কত কৃষিজমি হারিয়েছে এবং প্রত্যেকে কী পরিমাণ খাদ্য ও নগদ সহায়তা পেয়েছেন—তার সমন্বিত তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। পরিদর্শন ও ঘোষণার বাইরে ত্রাণের ন্যায্যতা যাচাই করতে এই পরিবারভিত্তিক তথ্য জরুরি।
স্থায়ী সমাধান নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গঙ্গার প্রায় ২২ মিটার গভীর তলদেশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ফলে তীরের উপরে শুধু বালির বস্তা বা বাঁধ বসিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পাওয়া কঠিন। নদীর প্রবাহ, পলি, চর গঠন এবং তলদেশের ক্ষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে প্রকৌশল-পরিকল্পনা দরকার। এই ২২ মিটারের হিসাব এখনও প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা নয়; তাই কোন জায়গায় কী ধরনের প্রতিরোধ হবে, তা বিশেষজ্ঞ নকশার পরে স্থির করা উচিত।
ভাঙনের মানচিত্র প্রতিবছর হালনাগাদ করে বিপজ্জনক বসতি, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বাঁধের অগ্রাধিকার ঠিক করা যায়। নদীতে জমি হারানো পরিবারকে ক্ষতির প্রমাণ দিতে বারবার পুরনো খতিয়ান ও নতুন মানচিত্রের ফাঁকে ঘুরতে হলে ক্ষতিপূরণ দেরি হয়। জেলা স্তরে এক জানালার দাবি-ব্যবস্থা, উপগ্রহচিত্রে জমি হারানোর যাচাই এবং আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে লিখিত কারণ প্রয়োজন। নদীর গর্ভে চলে যাওয়া জমির খাজনা ও ঋণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধন করতে হবে।
ভাঙন গঙ্গার এক তীর বা এক রাজ্যের সমস্যা নয়। মালদহের উপরিভাগে ঝাড়খণ্ড–বিহারের প্রবাহ, ফরাক্কা অঞ্চলের পলি এবং নিচে মুর্শিদাবাদের নদীগতি পরস্পর যুক্ত। রাজ্যের মন্ত্রীরা কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের যৌথ বৈঠকের প্রয়োজন স্বীকার করেছেন। স্থায়ী ব্যবস্থা বলতে তাই এক জেলার বিচ্ছিন্ন পাথর ফেলা নয়; অববাহিকাভিত্তিক সমীক্ষা, সীমান্তবর্তী প্রকল্পের সমন্বয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী অর্থ প্রয়োজন।
বন্যায় প্রথম কাজ অবশ্যই খাদ্য, জল, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু ভাঙনপীড়িত মানুষের ক্ষতি কেবল একটি বর্ষার নয়। জমির দলিল থাকলেও জমি নদীতে চলে গেলে ঋণ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্রশাসনিক শ্রেণি অস্পষ্ট হয়ে যায়। যে পরিবার বারবার সরে যায়, তাকে প্রতিবার অস্থায়ী ত্রাণ না-দিয়ে বসতভিটা, জীবিকা এবং বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকতার অধিকার দিতে হবে।
মন্ত্রীদের সফর সমস্যাটিকে দৃশ্যমান করেছে; এখন প্রয়োজন সময়বদ্ধ কাজের তালিকা। কোথায় জরুরি বাঁধ মেরামত, কোথায় স্থানান্তর, কবে যৌথ বৈঠক এবং কারিগরি সমীক্ষা জনসমক্ষে কবে আসবে—এগুলি জানানো উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, জমি ও বিদ্যালয়ের একক তালিকা না-থাকলে একই মানুষ বারবার নথি জমা দিয়েও সহায়তা থেকে বাদ পড়তে পারেন। নদীকে পুরোপুরি স্থির রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু নদীর গতিপথের অনিশ্চয়তার সব মূল্য দরিদ্র চরবাসীর উপর ছেড়ে দেওয়াও প্রশাসনিক নিয়তি নয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



