পেঁয়াজের দামে হঠাৎ আগুন কেন?

যা জানা জরুরি
- ভারতের রান্নাঘরে ফের অস্বস্তি বাড়িয়েছে পেঁয়াজ।
- কেন্দ্রীয় ক্রেতা-বিষয়ক দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর দেশে পেঁয়াজের গড় খুচরো দাম পৌঁছেছে কিলোগ্রাম-পিছু ৪৯ টাকা ৫৯ পয়সায়।
- শুধু বার্ষিক তুলনাই নয়—১ আগস্ট যে গড় দাম ছিল ৩৫ টাকা ৪৭ পয়সা, এক মাসের মধ্যে তা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের রান্নাঘরে ফের অস্বস্তি বাড়িয়েছে পেঁয়াজ। কেন্দ্রীয় ক্রেতা-বিষয়ক দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর দেশে পেঁয়াজের গড় খুচরো দাম পৌঁছেছে কিলোগ্রাম-পিছু ৪৯ টাকা ৫৯ পয়সায়। গত বছরের একই দিনে দাম ছিল ২৮ টাকা ৪৮ পয়সা। অর্থাৎ, এক বছরে বৃদ্ধি ৭৪ শতাংশেরও বেশি। শুধু বার্ষিক তুলনাই নয়—১ আগস্ট যে গড় দাম ছিল ৩৫ টাকা ৪৭ পয়সা, এক মাসের মধ্যে তা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। কলকাতা ও চেন্নাইয়ে দাম ছুঁয়েছে ৬০ টাকা; উত্তর ভারতের কয়েকটি বাজারে ৭০ টাকাও অতিক্রম করেছে। কিন্তু উৎপাদন যদি প্রায় আগের বছরের সমান হয়, তা হলে এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কেন?
পেঁয়াজের তিন মরসুম
ভারতে পেঁয়াজ মূলত তিনটি পর্যায়ে উৎপন্ন হয়—খরিফ, দেরিতে চাষ হওয়া খরিফ এবং রবি। এর মধ্যে মোট উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে রবি ফসল থেকে। মার্চ থেকে মে মাসে তোলা এই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ করা হয়। নতুন খরিফ পেঁয়াজ বাজারে আসার আগে আগস্ট-অক্টোবর তাই স্বাভাবিক ভাবেই সরবরাহের দুর্বল সময়।
২০২৫-২৬ সালে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রাথমিক অনুমান ৩০৭.৩৭ লক্ষ টন। আগের বছরের ৩০৭.৬৭ লক্ষ টনের তুলনায় তা প্রায় অপরিবর্তিত। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে পেঁয়াজের সামগ্রিক ঘাটতি নেই। জুলাইয়ের গোড়াতেও দৈনিক ৫০ হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে আসছিল। তার মধ্যে মহারাষ্ট্রের অবদানই ছিল ৩০ হাজার টনের বেশি। তা সত্ত্বেও সমস্যা তৈরি হয়েছে ফসল বাজারে পৌঁছনোর সময় ও গুণমান ঘিরে।
বৃষ্টি—কোথাও কম, কোথাও ক্ষতিকর
বর্ষার দেরিতে আগমন এবং অসম বৃষ্টিপাত এ বারের সঙ্কটের অন্যতম কারণ। মহারাষ্ট্রের নাসিক অঞ্চলে খরিফ পেঁয়াজের বপন প্রায় ১৫ দিন পিছিয়ে যায়। কর্নাটকের চিত্রদুর্গ ও চাল্লাকেরে অঞ্চলেও স্বাভাবিক এলাকার মাত্র ৬০ শতাংশে সময়মতো বপন হয়েছিল। ফলে নতুন ফসল বাজারে আসতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, কয়েকটি উৎপাদক অঞ্চলে অল্প সময়ের প্রবল বৃষ্টি মাঠের ফসল এবং গুদামে রাখা রবি পেঁয়াজের ক্ষতি করেছে। পেঁয়াজ সাধারণ শস্যের মতো দীর্ঘদিন নির্বিঘ্নে রাখা যায় না। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় তা পচে যায়, ছত্রাক ধরে অথবা অঙ্কুর বেরোয়। সংরক্ষণের সময় ওজনও কমে। ফলে সরকারি হিসাবে মজুত থাকলেও তার সবটা বিক্রিযোগ্য অবস্থায় থাকে না। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতির পরই কেন্দ্র ১৯টি শহরে ভর্তুকির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে।
আশঙ্কাকে পুঁজি করে মজুত
দামের এই বৃদ্ধির সবটাই কিন্তু প্রকৃত ঘাটতির ফল নয়। বর্ষা দুর্বল হওয়া এবং নতুন ফসল দেরিতে আসার খবর ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীদের একাংশ ভবিষ্যতে আরও বেশি দাম পাওয়ার আশায় বাজারে পেঁয়াজ ছাড়া কমিয়ে দেয়। জুলাই মাসেই কেন্দ্র জানিয়েছিল, বড় ভোগকেন্দ্রগুলিতে চাহিদা তেমন না বাড়লেও নাসিক এবং মধ্যপ্রদেশের বাজারে অনুমাননির্ভর কেনাবেচা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বড় চাষি, আড়তদার ও মজুতদারেরা অপেক্ষা করেন। দৈনিক বাজার-আগমন সামান্য কমলেই পাইকারি দাম দ্রুত বাড়ে। পরিবহণ, বাছাই, পচনজনিত ক্ষতি এবং খুচরো বিক্রেতার লাভ যোগ হয়ে সেই বৃদ্ধি ক্রেতার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে আরও বড় হয়ে যায়। উৎপাদক যে দাম পান এবং শহরের ক্রেতা যে দাম দেন—দুইয়ের ব্যবধান তাই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
সরকারি মজুত গড়তেও সমস্যা
দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য নাফেড ও জাতীয় সমবায় ক্রেতা সংস্থার মাধ্যমে পেঁয়াজ কিনে সংরক্ষণ করে কেন্দ্র। কিন্তু এ বছর সরকারি সংগ্রহের শুরু ছিল অত্যন্ত ধীর। জুন থেকে জুলাইয়ের গোড়া পর্যন্ত মাত্র প্রায় দু’হাজার টন পেঁয়াজ কেনা সম্ভব হয়েছিল। কারণ, সরকারি দর বাজারদরের তুলনায় কম থাকায় কৃষকেরা বেসরকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছিলেন।
ফলে সরকার সংগ্রহমূল্য পাঁচ দফায় বাড়িয়ে কুইন্টাল-পিছু ১,২৭০ টাকা থেকে ২,১২৫ টাকা করে। উদ্দেশ্য ছিল মূল্য-স্থিতিকরণ ভাণ্ডার দ্রুত পূরণ করা। কিন্তু সংগ্রহমূল্য বাড়ানোর মধ্যেও বাজার একটি বার্তা পেয়েছে—সরকার নিজেই আগামী দিনে দাম বাড়ার আশঙ্কা করছে। সেটিও মজুতদারদের অপেক্ষার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
দাম কবে কমতে পারে?
কেন্দ্র এখন ১৯টি শহরে কিলোগ্রাম-পিছু ৩৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করছে। দিল্লিতে এক হাজার টন সরবরাহের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যের দোকান ও চলমান বিক্রয়যান ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি ভাণ্ডার থেকে পাইকারি বাজারেও পেঁয়াজ ছাড়া হলে সাময়িক ভাবে দাম কিছুটা নামতে পারে।
তবে স্থায়ী স্বস্তি নির্ভর করবে নতুন খরিফ ফসলের উপর। সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া অনুকূল থাকলে অক্টোবরের শেষ থেকে বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে। কিন্তু ফসল আরও পিছিয়ে গেলে উৎসবের মরসুম পর্যন্ত দাম চড়া থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি তাই নিছক উৎপাদন-ঘাটতির গল্প নয়; মরসুমি সরবরাহের ফাঁক, পচন, বিলম্বিত বপন, দুর্বল সরকারি সংগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ ঘাটতির আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে মজুতদারি—সব মিলিয়েই পেঁয়াজের বাজারে এই আগুন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



