ডায়াবেটিস আর প্রেসার—একই রোগ?

যা জানা জরুরি
- ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ—দুটি নাম প্রায়ই পাশাপাশি শোনা যায়।
- অনেকের শরীরেই আবার দু’টি সমস্যা একসঙ্গে দেখা যায়।
- তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, রোগ দুটির মধ্যে কি সত্যিই কোনও গভীর যোগসূত্র রয়েছে?
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ—দুটি নাম প্রায়ই পাশাপাশি শোনা যায়। অনেকের শরীরেই আবার দু’টি সমস্যা একসঙ্গে দেখা যায়। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, রোগ দুটির মধ্যে কি সত্যিই কোনও গভীর যোগসূত্র রয়েছে? সম্প্রতি অন্তঃস্রাব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গগনদীপ সিংয়ের একটি বক্তব্য সেই প্রশ্নকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে। তাঁর দাবি, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ আলাদা কোনও রোগ নয়, বরং একই সমস্যার শরীরে দুটি ভিন্ন প্রকাশ।
সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “একই রকম নয়, পরস্পরের সঙ্গে শুধু সম্পর্কিতও নয়। একই রোগ শরীরের দুটি আলাদা জায়গায় দুটি ভিন্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।”
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি সাড়া দেওয়া বন্ধ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে। অন্য দিকে, কিডনি শরীরে সোডিয়াম ধরে রাখলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, একই হরমোন-নির্ভর প্রক্রিয়া থেকে দু’টি সমস্যার সূত্রপাত হতে পারে।
এমনকি টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের বড় একটি অংশের পরবর্তী সময়ে উচ্চ রক্তচাপও দেখা যায় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে কি সত্যিই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ একই রোগ?
উত্তরটি হল—না। তবে দু’টির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে।
ওকহার্ট হাসপাতালের পরামর্শদাতা অন্তঃস্রাব ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রণব ঘোড়ির মতে, “টাইপ–২ ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ দুটি পৃথক শারীরিক সমস্যা। যদিও রোগ দুটি প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যায় এবং এগুলির ঝুঁকির বেশ কয়েকটি কারণও অভিন্ন।”
অর্থাৎ, সম্পর্ক রয়েছে ঠিকই, কিন্তু দু’টি রোগকে এক করে ফেলা ঠিক নয়।
তাহলে যোগসূত্র কোথায়?
ইনসুলিন প্রতিরোধ, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং বংশগত প্রবণতা—এই সবক’টি কারণই ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে রোগ দুটি শরীরের আলাদা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।
চিকিৎসক ঘোড়ির কথায়, “ডায়াবেটিসের প্রধান বিষয় হল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গোলযোগ। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকাকেই উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়।”
সহজ করে বললে, একটির কেন্দ্রে রয়েছে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, অন্যটির কেন্দ্রে রক্তনালির উপর অতিরিক্ত চাপ।
ইনসুলিন প্রতিরোধের ভূমিকা কী?
শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি স্বাভাবিক ভাবে সাড়া না দিলে তাকে বলা হয় ইনসুলিন প্রতিরোধ। এই পরিস্থিতিতে রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষের ভিতরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য শরীরকে বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে হয়।
অগ্ন্যাশয় প্রথম দিকে অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘদিন এই চাপ চলতে থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
কিন্তু ইনসুলিন প্রতিরোধের প্রভাব শুধু রক্তে শর্করাতেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসক ঘোড়ির ব্যাখ্যা, এর সঙ্গে কিডনি, রক্তনালি এবং স্নায়ুতন্ত্রের কিছু পরিবর্তনেরও সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে শরীরে সোডিয়াম জমার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে।
তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—ইনসুলিন প্রতিরোধকে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের একমাত্র কারণ বলা যাবে না।
চিকিৎসকের মতে, দু’টি রোগের মধ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি জৈবিক সেতু হলেও সামগ্রিক ছবির মাত্র একটি অংশ।
ইনসুলিন কমলেই কি ‘সুগার’ আর প্রেসার—দুটিই কমবে?
গগনদীপ সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ইনসুলিনের মাত্রা কমানো গেলে রক্তে শর্করা এবং রক্তচাপ—দুটিরই উন্নতি হতে পারে।
তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। জীবনযাপনে পরিবর্তন অবশ্যই দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। চিকিৎসক ঘোড়ির কথায়, সামান্য ওজন কমালেও ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে, রক্তে শর্করা কমতে পারে এবং রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
হাঁটুন, নড়াচড়া করুন
নিয়মিত শরীরচর্চা পেশিকে আরও কার্যকর ভাবে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। তাই নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ড বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পাতে কী থাকছে, নজর দিন
খাদ্যাভ্যাসেও নজর দেওয়া জরুরি। শাকসবজি, পূর্ণশস্য, ডাল এবং পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। অন্য দিকে, পরিশোধিত শর্করা, অতিরিক্ত নুন এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো উপকারী।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস একসঙ্গে রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ—দুটিই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ঘুমও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়
শুধু খাবার আর ব্যায়াম নয়, ঘুম এবং মানসিক চাপের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। চিকিৎসক ঘোড়ির মতে, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে।
দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি বা মানসিক চাপ শরীরের বিপাকক্রিয়ার বিভিন্ন দিককে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় ঘুম ও মানসিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
জীবনযাপন বদলালেই কি ওষুধ বন্ধ?
একেবারেই নয়—এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার।
চিকিৎসক ঘোড়ির মতে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ফলে কখনও কখনও ওষুধের প্রয়োজন কমতে পারে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন চিকিৎসকের নির্ধারিত চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং তার সহায়ক।
তাই শেষ কথা হল, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ একই রোগ নয়। তবে দু’টির মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট গভীর জৈবিক যোগসূত্র। ইনসুলিন প্রতিরোধ সেই যোগসূত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন, কম শারীরিক পরিশ্রম, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ এবং বংশগত বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়েই তৈরি হয় ঝুঁকির জটিল সমীকরণ।
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে উপলব্ধ তথ্য এবং বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। নিজের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ বন্ধ করবেন না বা চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাপনে বড় পরিবর্তন আনবেন না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



