মাত্র এক মাসের মধ্যে খুচরো বাজারে এক কিলোগ্রাম চিনির গড় দাম ৪৮ টাকা ১৮ পয়সা থেকে বেড়ে ৫৫ টাকা ৭০ পয়সায় পৌঁছেছে। বহু জায়গায় তা ৫৮ থেকে ৬০ টাকাও ছুঁয়েছে। পাইকারি বাজারের কোনও কোনও কেন্দ্রে গত দু’মাসে দাম বৃদ্ধির হার আরও বেশি। উৎসবের মরসুম শুরুর মুখে এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ক্রেতার সংসার থেকে মিষ্টি, বিস্কুট, পানীয় ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প—সকলের হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, পেট্রলে মেশানোর জন্য ইথানল তৈরিতে বিপুল পরিমাণ আখ ও আখের রস সরিয়ে দেওয়াই চিনির ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। কেন্দ্র এই ব্যাখ্যা মানছে না। সরকারের বক্তব্য, ইথানলের চেয়ে অনেক বড় কারণ হল প্রত্যাশার তুলনায় কম উৎপাদন, আখের রোগ, অতিবৃষ্টিতে জল জমে যাওয়া, উৎসবের আগাম চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের সংকোচন এবং মজুতদারদের কারসাজি।

দুই পক্ষের বক্তব্যের মাঝখানেই প্রকৃত উত্তরটি রয়েছে। ইথানল একমাত্র কারণ নয়; কিন্তু দেশের চিনির মজুত যখন এমনিতেই কমছিল, তখন আখজাত কাঁচামালের একটি অংশ ইথানলে চলে যাওয়ায় বাজারের হাতে থাকা নিরাপত্তার পরিসর অবশ্যই সংকুচিত হয়েছে। তার উপর উৎপাদনের হিসাব ভুল প্রমাণিত হওয়া, রপ্তানির অনুমতি এবং সময়ে নীতিগত সংশোধন না করা—এই সবের সম্মিলিত ফলেই দাম এত দ্রুত বেড়েছে।

ঠিক কতটা বেড়েছে দাম?

কেন্দ্রীয় খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ জুলাই দেশে চিনির গড় খুচরো দাম ছিল কিলোগ্রামপিছু ৪৮ টাকা ১৮ পয়সা। ২০ আগস্ট তা বেড়ে হয় ৫৫ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসে বৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ। ২১ আগস্ট কোনও কোনও বাজারে গড় দাম ৫৮ টাকা ২০ পয়সায় পৌঁছয়—এক মাস আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।

পাইকারি ও কল-দরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রের কোলাপুরের মতো প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে প্রতি ১০০ কিলোগ্রামের দর ৫,৩৫০ টাকা ছুঁয়েছে। গত দু’মাসে দেশের কোনও কোনও বাজারে মূল্যবৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশ বলে বাণিজ্যিক তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। খুচরো বাজারে তার সম্পূর্ণ অভিঘাত এখনও পৌঁছয়নি। ফলে আমদানি করা চিনি আসতে দেরি হলে অথবা নতুন মরসুমের উৎপাদন সময়মতো শুরু না হলে ক্রেতাকে আরও কিছুটা বেশি দাম দিতে হতে পারে।

চিনির দাম রাজনৈতিক ভাবেও স্পর্শকাতর। তার কারণ শুধু চায়ে বা মিষ্টিতে চিনির ব্যবহার নয়। বিস্কুট, পাউরুটি, পানীয়, দুগ্ধজাত খাবার, ওষুধ, ফল সংরক্ষণ, বেকারি এবং অসংখ্য ছোট খাদ্য ব্যবসার উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে চিনির দাম সরাসরি যুক্ত। ফলে চিনি মহার্ঘ হলে তার প্রভাব খাদ্য মূল্যস্ফীতির বহু শাখায় ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথম কারণ: উৎপাদনের হিসাব বড় রকম ভুল হয়েছে

চলতি ২০২৫-২৬ চিনি মরসুমের গোড়ায় আখ উৎপাদক রাজ্যগুলি ধারণা করেছিল, দেশে প্রায় ৩৪৩ লক্ষ টন চিনি উৎপাদিত হবে। শিল্পমহলের প্রাথমিক অনুমান ছিল আরও বেশি—প্রায় ৩৪৮ থেকে ৩৪৯ লক্ষ টন। বিপুল উৎপাদনের আশায় কেন্দ্র ইথানল তৈরির উপর বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং ১৫ লক্ষ টন চিনি রপ্তানির অনুমতি দেয়।

কিন্তু মরসুমের শেষ দিকে সরকারের সংশোধিত অনুমান নেমে এসেছে ৩০৬ লক্ষ টনে। প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় ঘাটতি ৩৭ লক্ষ টন, অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ। এক মাসে দেশের মোট ব্যবহারের পরিমাণ যেখানে আনুমানিক ২৩ থেকে ২৫ লক্ষ টন, সেখানে ৩৭ লক্ষ টনের অপ্রত্যাশিত উৎপাদন ঘাটতি বাজারের প্রায় দেড় মাসের সরবরাহের সমান।

সমস্যার শুরু এখানেই। কোনও পণ্যের বাজারে দাম শুধু বর্তমান মজুতের উপর নির্ভর করে না; আগামী কয়েক মাসে কতটা পণ্য পাওয়া যাবে, সেই প্রত্যাশাও দাম নির্ধারণ করে। চিনিকল, পাইকার, খাদ্য প্রস্তুতকারক এবং ব্যবসায়ীরা যখন বুঝলেন উৎপাদন আগের অনুমানের চেয়ে অনেক কম হবে, তখন সকলেই ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটাতে হাতে বেশি মজুত রাখতে চাইলেন। এই সতর্কতাই সম্মিলিত ভাবে বাজারে তাৎক্ষণিক জোগান আরও কমিয়ে দেয়।

মরসুমের শুরুতে দেশে চিনির উদ্বৃত্ত হবে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, কয়েক মাসের মধ্যে তা ঘাটতির আশঙ্কায় বদলে যায়। এই আকস্মিক প্রত্যাশা-বদলই মূল্যবৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক দ্রুত করেছে।

আখের রোগ ও অতিবৃষ্টির আঘাত

উৎপাদন কমার পিছনে আবহাওয়া এবং রোগ—দুইয়েরই ভূমিকা রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের আখখেতে ‘রেড রট’ বা লাল পচা রোগ এবং ‘টপ বোরার’ বা ডগা ছিদ্রকারী পোকার প্রকোপ দেখা গেছে। লাল পচা ছত্রাকঘটিত রোগ। এতে আখের ভিতরের অংশ লালচে হয়ে পচে যায়, গাছ শুকিয়ে পড়ে এবং আখের মধ্যে চিনির পরিমাণ কমে যায়। ডগা ছিদ্রকারী পোকা আখের বাড়ন্ত অংশ নষ্ট করে ফলন ও শর্করা পুনরুদ্ধারের হার—দুই-ই কমায়।

একই সঙ্গে মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং কয়েকটি আখ উৎপাদক অঞ্চলে অতিবৃষ্টির ফলে জমিতে দীর্ঘ সময় জল দাঁড়িয়ে ছিল। আখের জন্য প্রচুর জল প্রয়োজন হলেও জমে থাকা জল গাছের শিকড়ের ক্ষতি করে। ফলে বাইরে থেকে আখের পরিমাণ খুব কম বলে মনে না হলেও কলগুলিতে সেই আখ ভাঙিয়ে প্রত্যাশিত পরিমাণ চিনি পাওয়া যায় না।

চিনি শিল্পে শুধু কত টন আখ উৎপন্ন হয়েছে, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রতি ১০০ কিলোগ্রাম আখ থেকে কত কিলোগ্রাম চিনি পাওয়া যাচ্ছে—অর্থাৎ শর্করা পুনরুদ্ধারের হার—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আখের রোগ, আগাম ফুল আসা, অতিবৃষ্টি বা খরার কারণে এই হার সামান্য কমলেও জাতীয় উৎপাদনে তার ফল কয়েক লক্ষ টন হতে পারে।

মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের কিছু অঞ্চলে আখ আগাম ফুলে যাওয়ার কারণেও চিনির পরিমাণ কমেছে। কোথাও আবার গুড় ও খাণ্ডসারি প্রস্তুতকারকেরা বেশি দাম দেওয়ায় আখ চিনিকলে না গিয়ে অসংগঠিত উৎপাদনকেন্দ্রে চলে গেছে। সেই আখের হিসাব সরকারি চিনি উৎপাদনের মধ্যে আসে না।

তা হলে ইথানলের ভূমিকা কতটা?

আখের রস, চিনির সিরা এবং গুড়জাত উপজাত থেকে ইথানল তৈরি করা যায়। এই ইথানল পেট্রলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করলে অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমে, কৃষক ও চিনিকলের জন্য নতুন আয়ের রাস্তা তৈরি হয় এবং তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে।

ভারত ২০২৫ সালের মধ্যেই পেট্রলে গড়ে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্য অর্জন করেছে। এই কর্মসূচি সফল করতে চিনিকলগুলিকে সরাসরি আখের রস, চিনির সিরা এবং ‘বি-হেভি’ মোলাসেস থেকে ইথানল তৈরির অনুমতি ও আর্থিক উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। উদ্বৃত্ত চিনির বছরে এই ব্যবস্থা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। অতিরিক্ত চিনি গুদামে পড়ে থাকলে দাম কমে, চিনিকলের নগদের সংকট হয় এবং কৃষকের আখের দাম বকেয়া পড়ে। সেই উদ্বৃত্তকে ইথানলে রূপান্তর করলে কল দ্রুত টাকা পায় এবং কৃষকের পাওনা মেটাতে পারে।

২০২৫-২৬ মরসুমের শুরুতে প্রায় ৩৪ থেকে ৫০ লক্ষ টন চিনির সমতুল আখজাত পদার্থ ইথানল উৎপাদনে ব্যবহারের সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল। পরবর্তী হিসাবে প্রকৃত সরানোর পরিমাণ প্রায় ২৯ থেকে ৩৪ লক্ষ টনের মধ্যে বলে বিভিন্ন সরকারি ও শিল্প সূত্রে অনুমান করা হয়েছে। এই পরিমাণ মোটেই নগণ্য নয়। তা দেশের এক মাসেরও বেশি চিনি ব্যবহারের সমান।

বিরোধীদের যুক্তি তাই একেবারে ভিত্তিহীন নয়। যদি ইথানলের জন্য সরানো আখের একটি অংশ চিনি তৈরিতে ব্যবহার করা হত, বাজারে কয়েক লক্ষ টন অতিরিক্ত চিনি পাওয়া যেত। বর্তমানের মতো কম মজুতের পরিস্থিতিতে সেই অতিরিক্ত সরবরাহ মূল্যবৃদ্ধির চাপ নিঃসন্দেহে কমাত।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। ইথানলে আখ সরানো নিজে থেকে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়নি। কারণ মরসুমের গোড়া থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, ইথানল উৎপাদন চলা সত্ত্বেও, মহারাষ্ট্রে চিনিকল থেকে বিক্রির গড় দাম কিলোগ্রামপিছু ৩৮ টাকা ৩১ পয়সা থেকে কমে ৩৬ টাকা ৯৮ পয়সা হয়েছিল। দাম চড়তে শুরু করে তখনই, যখন উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হওয়ার তথ্য স্পষ্ট হয় এবং শেষ-মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

অর্থাৎ ইথানল ছিল বাজারের নিরাপত্তার গদি পাতলা করে দেওয়া একটি উপাদান; উৎপাদন বিপর্যয় ছিল সেই গদির উপর আকস্মিক আঘাত।

কেন্দ্র কেন ইথানলকে দায়ী করতে নারাজ?

সরকার দুটি পরিসংখ্যান সামনে এনেছে। প্রথমত, আখ থেকে পাওয়া চিনির সমতুল যে অংশ ইথানলে সরানো হয়েছে, তার অনুপাত ২০২২-২৩ সালের প্রায় ১২ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬ সালে প্রায় ৯ শতাংশে নেমেছে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে দেশের মোট ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই তৈরি হচ্ছে খাদ্যশস্য—বিশেষ করে ভুট্টা—থেকে। ফলে ইথানল কর্মসূচি মানেই বিপুল পরিমাণ আখ চিনির বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

এই যুক্তিতে সত্যতা আছে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ উত্তর নয়। মোট ইথানলের কত শতাংশ ভুট্টা থেকে তৈরি হচ্ছে, সেটি চিনির বাজারে প্রাসঙ্গিক হলেও নির্ণায়ক নয়। আসল প্রশ্ন, চলতি মরসুমে কত লক্ষ টন চিনির সমতুল আখজাত কাঁচামাল ইথানলে গেছে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার সংকেত পাওয়ার পর সেই সরানো কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

শতাংশ ১২ থেকে ৯-এ নামলেও ৯ শতাংশের বাস্তব পরিমাণ প্রায় ৩০ লক্ষ টন হতে পারে। বাজারে শেষ-মজুত যখন মাত্র ৩৩ থেকে ৩৪ লক্ষ টনে নামার আশঙ্কা, তখন এই ৩০ লক্ষ টনের অর্থ অন্য রকম। উদ্বৃত্ত উৎপাদনের বছরে যা অনায়াসে সামলানো যায়, ঘাটতির বছরে সেই একই পরিমাণ বাজারকে চাপে ফেলতে পারে।

তবে এটিও ঠিক যে ইথানল কর্মসূচি রাতারাতি বন্ধ করা সহজ নয়। চিনিকলগুলি ঋণ নিয়ে পাতনাগার নির্মাণ করেছে, তেল বিপণন সংস্থার সঙ্গে সরবরাহের চুক্তি করেছে এবং কৃষকদের পাওনা মেটানোর হিসাবও এই আয়ের উপর দাঁড়িয়ে। হঠাৎ সব আখ চিনি তৈরিতে ফেরালে কলের আর্থিক কাঠামো বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই সমস্যাটি ‘চিনি না ইথানল’—এমন সরল দ্বন্দ্ব নয়; বরং বছরে বছরে উৎপাদনের প্রকৃত অবস্থা দেখে দু’টির মধ্যে ভারসাম্য বদলানোর প্রশ্ন।

রপ্তানির অনুমতিও কি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?

মরসুমের শুরুতে বড় উদ্বৃত্তের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে কেন্দ্র ১৫ লক্ষ টন চিনি রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় বাজারে অতিরিক্ত জোগানের কারণে দাম যাতে উৎপাদন ব্যয়ের নীচে নেমে না যায় এবং চিনিকলগুলি যাতে কৃষকদের পাওনা মেটাতে পারে।

কিন্তু পরে উৎপাদন কমার সংকেত পাওয়া গেলেও রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করতে সময় লেগেছে। সরকারের বক্তব্য, জানুয়ারি নাগাদ ঘাটতির প্রাথমিক লক্ষণ মিললেও তখনও বহু কল আখ ভাঙাচ্ছিল এবং চূড়ান্ত উৎপাদন জানা যায়নি। মার্চে রপ্তানি শুরু হয়; উৎপাদন কম হবে নিশ্চিত হওয়ার পরে মে মাসের গোড়ায় তা বন্ধ করা হয়। ইতিমধ্যে প্রায় আট লক্ষ টনের কাছাকাছি চিনি বিদেশে চলে গেছে বলে বাজারের অনুমান।

৩৪৩ লক্ষ টন উৎপাদন হলে এই রপ্তানিতে সমস্যা হত না। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন ৩০৬ লক্ষ টনে নেমে আসার পরে রপ্তানি হওয়া প্রতিটি টন চিনিই দেশীয় মজুতের ঘাটতিকে বাড়িয়েছে। তাই ইথানলের পাশাপাশি ভুল উৎপাদন পূর্বাভাস এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া রপ্তানি-সিদ্ধান্তও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

ভারতের চিনি নীতির পুরনো অসুখ এখানেই—ভাল ফলনের বছরে উদ্বৃত্ত সামলাতে রপ্তানি ও ইথানল উৎসাহিত করা হয়, আর খারাপ ফলনের বছরে তড়িঘড়ি রপ্তানি বন্ধ, মজুতসীমা ও আমদানির পথে হাঁটতে হয়। উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য আগাম হিসাব না থাকায় নীতির এই দোলাচল বারবার দেখা দেয়।

উৎসবের চাহিদা কি এত বড় কারণ?

আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গণেশ চতুর্থী, দুর্গাপুজো, দশেরা, দীপাবলি এবং নানা আঞ্চলিক উৎসবের কারণে চিনির ব্যবহার বাড়ে। মিষ্টি, বিস্কুট, চকোলেট, পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য প্রস্তুতকারকেরা সাধারণত কয়েক মাস আগে থেকেই মজুত গড়ে তোলেন।

এই আগাম কেনাকাটা স্বাভাবিক বছরে দাম সামান্য বাড়ায়। কিন্তু চলতি বছরে উৎপাদন কম, উদ্বৃত্ত মজুত সীমিত এবং নতুন আখ ভাঙাই শুরু হতে এখনও সময় বাকি—এই পরিস্থিতিতে উৎসবের বাড়তি চাহিদা মূল্যবৃদ্ধিকে বহুগুণ তীব্র করেছে। বড় ক্রেতারা প্রত্যেকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে কিছুটা বেশি কিনলে বাজারে সম্মিলিত ভাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়।

সুতরাং উৎসব নিজে সংকট সৃষ্টি করেনি; আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা সরবরাহ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়িয়েছে।

মজুতদারি ও জল্পনার ভূমিকা

কেন্দ্র প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে, শিল্প ও বাণিজ্যের একাংশের জল্পনা এবং মজুতদারি দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকার যদি নিশ্চিত হয় দেশে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যাপ্ত চিনি আছে, অথচ দাম এক মাসে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ে, তা হলে ধরে নিতে হয় বাজারে থাকা সব চিনি স্বাভাবিক গতিতে বিক্রির জন্য বেরোচ্ছে না।

ব্যবসায়ীরা যখন মনে করেন আগামী সপ্তাহে আরও বেশি দাম পাওয়া যাবে, তখন তাঁরা বর্তমান দরে বিক্রি কমিয়ে দেন। খাদ্য প্রস্তুতকারকেরা বিপরীত আশঙ্কায় আগাম বেশি কিনে রাখেন। বিক্রেতার অপেক্ষা এবং ক্রেতার তাড়াহুড়োর মাঝখানে দাম দ্রুত লাফিয়ে ওঠে। কোনও প্রকৃত ঘাটতি যতটা দাম বাড়াত, ঘাটতির ভয় তার চেয়েও বেশি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই কারণেই সরকার ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চিনির ব্যবসায়ীদের মজুত সর্বোচ্চ ৪০০ টনে বেঁধে দিয়েছে। মাসে ১০ টনের বেশি চিনি ব্যবহারকারী বৃহৎ ক্রেতারা ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ দিনের প্রয়োজনের বেশি মজুত রাখতে পারবেন না। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ দল চিনিকলের গুদামে মজুতের সরেজমিন যাচাইও করছে। এই পদক্ষেপগুলিই প্রমাণ করে, সরকারও মনে করছে বাজারের মূল্যবৃদ্ধির পুরোটাই ফসলের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

আন্তর্জাতিক বাজারও কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত সাধারণত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিনি উৎপাদক এবং বৃহত্তম ভোক্তা। দেশের প্রয়োজনের অধিকাংশই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে মেটে। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক দাম দেশীয় বাজারকে প্রভাবিত করে। কারণ বিশ্ববাজারে দাম বেশি হলে রপ্তানির আকর্ষণ বাড়ে, আমদানি ব্যয়বহুল হয় এবং দেশীয় ব্যবসায়ীরাও ভবিষ্যৎ দরের প্রত্যাশা বদলে ফেলেন।

২০২৬-২৭ সালে বিশ্ববাজারে প্রায় ৩৩ লক্ষ টন চিনির ঘাটতির পূর্বাভাস রয়েছে। আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন চিনির দাম ৩০ জুনের ৪৭৪ ডলার থেকে ২০ আগস্টে ৫৫২ ডলারে উঠেছে—দু’মাসেরও কম সময়ে বৃদ্ধি ১৬ শতাংশের বেশি।

ভারত যখন শুল্কমুক্ত আমদানির ঘোষণা করে, তখন লন্ডনের সাদা চিনি এবং নিউ ইয়র্কের কাঁচা চিনির আগাম-বাজারে দর এক দিনে প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। অর্থাৎ ভারতের ১০ লক্ষ টন সম্ভাব্য কেনাকাটাই বিশ্ববাজারকে আরও উত্তপ্ত করেছে। ফলে আমদানির সিদ্ধান্ত দেশীয় বাজারে স্বস্তির বার্তা দিলেও আমদানি করা চিনি খুব সস্তা হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

সরকার কী করছে?

কেন্দ্র ১০ লক্ষ টন কাঁচা চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে। সাধারণত আমদানির উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক থাকে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারত দেশীয় বাজারের জন্য এত বড় পরিমাণ চিনি আমদানির পথে গেল।

বন্দরসংলগ্ন শোধনাগারগুলি বিদেশ থেকে আনা কাঁচা চিনি পরিশোধন করে সাধারণত আবার রপ্তানি করে। এখন তাদের হাতে থাকা বা নতুন করে আমদানি করা চিনি দেশীয় বাজারে বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তুলনামূলক দ্রুত প্রায় তিন লক্ষ টন চিনি বাজারে আসতে পারে।

তবে ব্রাজিল থেকে নতুন কাঁচা চিনি জাহাজে ভারতে পৌঁছতে প্রায় দু’মাস লাগতে পারে। ফলে আমদানির বড় অংশ অক্টোবরের আগে বাজারে আসার সম্ভাবনা কম। আমদানিকারকদের ২১ থেকে ২৮ আগস্টের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে পণ্য আনার অঙ্গীকার করলে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আমদানির সময়সীমা ৩১ অক্টোবর।

রাজ্য ও চিনিকলগুলিকে ১৫ অক্টোবর থেকে নতুন আখ ভাঙাই শুরু করার পরামর্শও দিয়েছে কেন্দ্র। সাধারণত অক্টোবরে তিন থেকে চার লক্ষ টন নতুন চিনি তৈরি হয়। ভাঙাই এগিয়ে আনা গেলে এ বছর সেই উৎপাদন ১০ লক্ষ টনের বেশি হতে পারে বলে সরকারের আশা। উৎসবের সময় বাজারে এই অতিরিক্ত জোগান এলে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষক, কল ও ক্রেতা—তিন পক্ষের টানাপোড়েন

চিনির দামের প্রশ্নটিকে শুধু ক্রেতার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। সরকার আখের ন্যায্য ও লাভজনক মূল্য নির্ধারণ করে। কয়েকটি রাজ্য তার চেয়েও বেশি দাম স্থির করে। চিনির বাজারদর কমে গেলে কলগুলি আখের মূল্য সময়মতো দিতে পারে না। অতীতে কৃষকদের হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ার নজির রয়েছে।

ইথানল সেই সমস্যার অনেকটাই কমিয়েছে। নিশ্চিত দরে তেল সংস্থার কাছে ইথানল বিক্রি করে কল দ্রুত নগদ পায়। সরকারের দাবি, ২০২৫-২৬ মরসুমের আখের পাওনার প্রায় ৯৭ শতাংশ ইতিমধ্যেই কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। এই সাফল্যের পিছনে ইথানলের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু ভোক্তার স্বার্থও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বৃত্ত সামলানোর স্থায়ী পদ্ধতি হিসেবে শুরু হওয়া ইথানল উৎপাদন যদি প্রতি বছর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, তা হলে কম ফলনের বছরে খাদ্য ও জ্বালানির মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। নীতির মূল সূত্র হওয়া উচিত—প্রথমে দেশের খাদ্যচাহিদা ও ন্যূনতম নিরাপত্তা-মজুত, তার পরে ইথানল ও রপ্তানি।

শেষ পর্যন্ত দায় কার?

বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু ইথানলকে দায়ী করা অতিসরলীকরণ। কারণ ইথানলের জন্য আখ সরানো চলছিল বহু মাস ধরে, অথচ এপ্রিল পর্যন্ত চিনির কল-দর কমছিল। দাম হঠাৎ বেড়েছে মূলত উৎপাদন পূর্বাভাস ৩৪৩ লক্ষ টন থেকে ৩০৬ লক্ষ টনে নেমে আসার পরে। রোগ, অতিবৃষ্টি, কম শর্করা পুনরুদ্ধার, গুড় তৈরিতে আখ চলে যাওয়া, উৎসবের আগাম চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারের ঘাটতি এবং মজুতদারি—সবই এই উত্থানে অংশ নিয়েছে।

আবার সরকারের বক্তব্যও সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়। প্রায় ৩০ লক্ষ টনের সমতুল কাঁচামাল ইথানলে না গেলে বাজারের হাতে বাড়তি সুরক্ষা থাকত। উৎপাদন সম্পর্কে প্রথম সতর্কসংকেত পাওয়ার পরে ইথানল সরানো ও রপ্তানি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা যেত কি না, সেই প্রশ্নের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এখন ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্তই দেখিয়ে দেয়, মরসুমের শুরুতে উদ্বৃত্তের যে হিসাব করা হয়েছিল তা কতখানি ভুল ছিল।

সবচেয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত তাই এই: ইথানল বর্তমান সংকটের একমাত্র আগুন নয়, কিন্তু আগুন ছড়ানোর মতো শুকনো কাঠের একটি অংশ অবশ্যই। মূল স্ফুলিঙ্গ এসেছে উৎপাদন বিপর্যয় থেকে; ভুল পূর্বাভাস, রপ্তানি, কম মজুত, উৎসবের চাহিদা ও বাজারের জল্পনা তাকে দাবানলে পরিণত করেছে।

অক্টোবরে আমদানি করা চিনি এবং নতুন মরসুমের উৎপাদন একসঙ্গে বাজারে এলে দাম কিছুটা নামতে পারে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান আমদানিতে নয়। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ফসল-সমীক্ষা, আখের রোগের আগাম নজরদারি, বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা-মজুত এবং এমন নমনীয় ইথানল নীতি, যা উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ভাবে আখের রসকে জ্বালানি থেকে খাদ্যের দিকে ফেরাবে।

না হলে একই চক্র চলবে—উৎপাদন বেশি হলে রপ্তানি ও ইথানলের উৎসাহ, উৎপাদন কমলে আচমকা নিষেধাজ্ঞা ও আমদানি; আর প্রতিবারই তার মূল্য দেবেন কখনও কৃষক, কখনও চিনিকল, কখনও সাধারণ ক্রেতা।